Monday, June 22, 2020

পশ্চিমবঙ্গের করোনা লড়াই - 
জুন তো শেষ হতে চলল, কি অবস্থা ? 
(করোনা বিজ্ঞানের খুচরো খবর - ১১)


ইংরিজিতে একটা কথা আছে -  the other side of the river is green. সোজা কথায় 'ওদের ওদিকে সব ভাল, আমাদের এদিকে সব খারাপ'। করোনা নিয়েও একই কথা চলছে।  নিজেরাই চিন্তিত হয়ে বলছি 'খুব করোনা ছড়াচ্ছে, কি যে হবে?' আবার যেহেতু যে কোন সমাজের একটা বড় জিনিস হল self-contradiction বা  নিজস্ব-বিরোধিতা ওই হাহুতাশ করার পরমুহূর্তে নিজেরাই অনেকে মাস্ক না পরে বা থুতনি'র কাছে পরে করোনা ছড়াতে 'সাহায্য করছি' ।আবার পরের দিন 'কাগজ বা খবর দেখতে দেখতে হায়-হায়  করছি, 'আজ আরও করোনা ছড়িয়েছে' ।  

করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা যে দেশে ভালোই বেড়ে চলেছে, এবং ভারত যে 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভের' দিকে দ্রুত এগোচ্ছে সেটাও আমাদের অজানা নয়। তবে সে  সব পরিসংখ্যান নিয়ে বেশ কিছুটা লেখা হয়েছে। এখানে আমরা দেখার চেষ্টা করছি জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে আমাদের রাজ্যের কি অবস্থা। কারণ একটাই - তার সঙ্গেই আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ সবচেয়ে বেশি জড়িত।

আসুন, পশ্চিমবঙ্গে covid-১৯ পরিস্থিতি কেমন, উন্নতি হল না অবনতি , সেটা একটু দেখা যাক।  

প্রশ্ন: আমাদের রাজ্যের হাল কি সবচেয়ে খারাপ? 
উত্তর: উত্তর যে 'না' সেটা আমাদের অজানা নয়।  দুর্ভাগ্যবশত, মহারাষ্ট্র, গুজরাট দিল্লী ও চেন্নাইবাসীরা আজ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিপদে পড়েছেন সেটা আমরা মোটামুটি জানি।  তাও, যদি মে আর জুন মাসের পরিসংখ্যান গ্রাফ এঁকে দেখাই তাহলে এইরকম দেখাবে।  

নীচে দেখুন।  X-axis হচ্ছে সময় - অর্থাৎ ৪ঠা মে থেকে ১৯শে জুন অবধি 'দিনলিপি'।  আরY-axis হচ্ছে  3-day average for positives/tests % , অর্থাৎ দিনে কত টেস্ট হল আর তার মধ্যে কজনের করোনা ধরা পড়ল তার percentage. এই percentageর ফলাফল দেখতে হবে কারন স্বাভাবিক ভাবে সারা দেশের দৈনিক টেস্ট সংখ্যা এবং আক্রান্ত সংখ্যা এই রাজ্য (বা যে কোন রাজ্যের) তুলনায় অনেক বেশি হবে, সুতরাং তুলনা করার মানে হয় না ।  শুধু তাই না, দিনকে দিন আক্রান্তের সংখ্যা কিরকম বাড়ছে বা কমছে বা একই রকম থাকছে তার একটা ভাল আন্দাজ পাওয়া যায় এইpercentage থেকে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, এখানে তিন দিনের এভারেজ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছি।ধরুন, গ্রাফে প্রথম পয়েন্ট হল ১৬, ১৭, ১৮ই মে'র এভারেজে; দ্বিতীয় পয়েন্ট হল ১৭, ১৮, ১৯ মে'র এভারেজ। এরকম করে চলতে থাকে।  তাতে যে দৈনন্দিন noise কমে যায়, trend বুঝতে সুবিধে হয়।  এই দেখুন গ্রাফ।



ভারতের  positives/tests ratio যে মোটের ওপর বেড়েই চলেছে সে তো পরিষ্কার।  আর পশ্চিমবঙ্গ? যেটা  লক্ষণীয় সেটা হল যে মে মাসের গোড়ার দিকে রাজ্যের এই এভারেজ positives/tests % সমগ্র ভারতের %র মাথায় মাথায় বা অল্প বেশি ছিল !  কিন্তু, তারপর রাজ্য যখন এপ্রিল মাসের 'ল্যাদ খাওয়া' ছেড়ে অনেক বেশি টেস্ট করতে শুরু করে এই %ও উন্নতি করতে থাকে (অর্থাৎ কমতে থাকে) এবং ভারতের ratio বাড়তে থাকলেও মে মাসের মাঝামাঝি এই রাজ্যের % যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছিল দেখাই যাচ্ছে। এর থেকে দুটি ব্যাপার conclude করা যেতে পারে।  এক, পশ্চিমবঙ্গে আগে  মূলত রুগী তাঁর কাছাকাছি যাঁরা আছেন তাদের পরীক্ষা হচ্ছিল। তাই পসিটিভ বেশি ছিল আর ratio বেশি হচ্ছিল । কিন্তু, মে মাস থেকে আক্রান্ত খোঁজার জন্যে টেস্ট আরো বাড়ানো হয় এবং দেখা যায় যে অনেকের জ্বর সর্দি কাশি হলেও তিনি নতুন করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত নন, রেসাল্ট নেগেটিভ আসছে আর ওই % কমতে শুরু করে। আর তাছাড়া,  যত টেস্ট হবে তত আক্রান্ত ধরা পড়বেন তত তাঁদের চিকিৎসা বা কোয়ারেন্টাইন হবে, রোগের ছড়িয়ে পড়া আটকাবে - সোজা হিসেবে। একটু দেরি করে হলেও, রাজ্য যে সেই পথে দেড় মাসের বেশি এগিয়েছে দেখে ভাল লাগল। 
 (এই গ্রাফে আবার ফিরে আসব। দরকার আছে)  

প্রশ্ন: ভারতের positives/tests % কেন বাড়ছিল? 
উত্তর: কারন মহারাষ্ট্র, গুজরাটের, তামিল নাড়ুও দিল্লীর positives/tests % অনেক ওপরের দিকে।  তাই কেরল বা উড়িষ্যা বা পশ্চিমবঙ্গ কমের ওপর থাকলেও জাতীয় positives/tests % অনেক বেড়ে যাচ্ছে।  যেমন এই গ্রাফে ধরা পড়ছে  গুজরাটের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তুলনামূলক বিচার।গুজরাটের positives/tests % যে গত দেড় মাস ধরে অনেক বেশি সেটা তো পরিষ্কার। আমার ধারণা মহারাষ্ট্র বা দিল্লীর পরিসংখ্যান  গ্রাফে দিলে গুজরাটের তুলনায় বেশি তবু কম হবে না।  

 গুজরাটবাসীকে ছোট করে দেখানো আমার লক্ষ্য নয় ;প্রসঙ্গত বলে রাখি, জীবনের  গুরুত্বপূর্ণ দুটি বছর আমি গুজরাটে কাটিয়েছি। বহু বন্ধু গুজরাটি, এবং আজ তাদের জন্যে, তাদের বাবা মা'র জন্যে আমি বেশ চিন্তিত। কিন্তু, বহু প্রচারিত 'গুজরাট মডেল' যে বিপদের দিনে চিকিৎসাক্ষেত্রে কাজের নয় সেটা দেখাই যাচ্ছে।   

প্রশ্ন: গুজরাটের অবস্থা যে খারাপ সে তো আমরা জানি।যে সব রাজ্য covid-১৯কে ভাল ট্যাকেল করেছে বলে খবর আসছে তাদের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কি? 
উত্তর: কেরলকে ধরছি না - ওঁরা যা করেছেন তা এক কথায় অনন্য, দেখবেন ভবিষ্যতে মেডিকেলের পাঠ্যপুস্তকেও কেরলের রোগ-প্রতিরোধ লড়াই'র স্ট্রাটেজি স্থান পেতে পারে। এক্ষেত্রে উড়িষ্যা ও কর্ণাটক - এমন দুটি রাজ্য যাঁরা কোরোনাভাইরাসকে যথেষ্ঠ ভাল আটকেছেন বলে খবর আছে - তাদের সঙ্গে এই রাজ্যের পরিসংখ্যান পাশাপাশি ফেলে দেখা যাক।আর আছে বিহারের পরিসংখ্যান। বেশি কথায় কাজ নেই, আবার গ্রাফ । 



উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গ যে মোটামুটি একই positives/tests% দিচ্ছে দেখতেই পারছেন।কিন্তু দুই রাজ্যের ট্রেন্ড বা সার্বিক লক্ষণ যে একই সেটা অনস্বীকার্য। জাতীয় গড় %র অনেক তলায়। আর কর্ণাটকের অবস্থা এই দুই রাজ্যের তুলনায় একটু better.  বিহার একসময় খুব বেশি পসিটিভ ধরা পড়ছিল কিন্তু এখন দেখছি কমে কমে উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের তলায় চলে গিয়ে কর্ণাটকের লাগোয়া। ..... 

মূল আশস্থকর কথা - পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা সব রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ, এটা ভয়ানক  গাঁজা এবং মনে করার কোন তথ্যভিত্তিক কারণ নেই। বরঞ্চ, কেরলের মত না হলেও উড়িষ্যা ও কর্ণাটকের মত covid ঠেকানোয় পারদর্শী রাজ্যের সমগোত্রেই পড়বেন এ রাজ্যের চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মীরা।
আর এসব দেখেও কেউ যদি কেউ বলেন যে এই সব তথ্য ভুল তাহলে প্রথম প্রশ্নই হবে অন্য কোন বিজ্ঞান-ভিত্তিক জাতীয় স্তরে প্রকাশিত পরিসংখ্যান  আপনার হাতে আছে ? তখন কিন্তু ঠিকঠাক উত্তর দিতে হবে।তখন  'ওসব বাজে কথা' 'জানি জানি আমরা জানি' হোয়াটস্যাপ-বাতেলা মারলে চলবে না।  

প্রশ্ন: এমনও তো হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ ওই দুই রাজ্যের তুলনায় কম টেস্ট করছে বলে মনে হচ্ছে ওদের মত অবস্থা।  আসলে অনেক খারাপ? 
উত্তর: না।  এই প্রশ্ন আমার মনেও এসেছিল কিন্তু তারপর পরিসংখ্যান দেখে আমি নিজেই অবাক।  কারণ ১৬ই মে থেকে ১৯শে জুন, এই চৌত্রিশ দিনে (যা ওই গ্রাফের সময়-পরিধি ) 
পশ্চিমবঙ্গে টেস্ট হয়েছে 303,324 (average 8921 tests per day), 
উড়িষ্যায় টেস্ট হয়েছে 130,467 (average 3837 tests per day),
বিহারে টেস্ট হয়েছে 101, 222 (average 2977 test per day)
 গুজরাটে টেস্ট হয়েছে 175,900 (average 5173 tests per day) আর 
কর্নাটকে টেস্ট হয়েছে 344,036 (average 10, 118 tests per day) . 
অর্থাৎ বিহার, উড়িষ্যা ও গুজরাটের থেকে দৈনিক টেস্ট সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গ অনেক এগিয়ে এবং মোটামুটি কর্ণাটকের কাছাকাছি।  

এ বেশ বড় সাফল্য। যে রাজ্য এপ্রিলের শেষে দিনে ১০০০-১২০০ টেস্ট করছিল সেই রাজ্য গত এক মাসের বেশি দৈনিক ৯০০০ মত টেস্ট করেছে (সাইক্লোনের দুদিন বাদ দিলে - তখন ৪০০০-৫০০০ হয়েছিল) এবং গত দুদিনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দশ হাজারের বেশি পরীক্ষা হয়েছে। এর প্রধান কারণ নিশ্চয়ই টেস্ট ল্যাব বাড়ানো।  ৪ঠা মে রাজ্যে টেস্ট করার ল্যাব ছিল ১৬টি, আর আজ ২১শে জুন সেই সংখ্যা হল ৪৯. তিনগুন বৃদ্ধি।  শুধু তাই নয়, খবর পেয়েছি যে প্রতি জেলায় টেস্ট সেন্টার তৈরির কাজ বেশ কিছুটা এগিয়েছে কিংবা টেস্ট শুরু হবার মুখে। অবশ্য,  contact tracing কতদূর হচ্ছে সেটা এইসব তথ্য দেখে বোঝা যাবে না, কিন্তু টেস্ট সংখ্যা এত বাড়ানো তো ভাল বলতেই হবে।  (পার্টিগত রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকলে অন্য ব্যাপার....) 
সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিসংখ্যান অনেকাংশে ওই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।  না, কম-টেস্ট-তাই-কম-পসিটিভ এই ব্যাপারটা আর সেভাবে এই রাজ্যের ক্ষেত্রে খাটে না. বরং, এখন উল্টে প্রশ্ন করা যেতে পারে বিহার, উড়িষ্যা বা তেলেঙ্গানা কম টেস্ট করছে কেন?  
শুনেছি যে উড়িষ্যার contact ট্রেসিং খুবই ভাল।  হতেই পারে, আর তাছাড়া জনসংখ্যা তেমন বড় না।  তাই কম টেস্ট করে হয়ত চলতেই পারে।  কিন্তু, বিহার ? বিহারের জনসংখ্যা ১১.৯৫ কোটি আর পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা তার থেকে ২.২ কোটি কম।  অথচ, ওঁদের ওখানে টেস্ট হচ্ছে গড়ে পশ্চিমবঙ্গের এক তৃতীয়াংশ । সুতরাং,একটা 'খচখচ' থেকেই যাচ্ছে।

এটা ঠোকার জন্যে বলছি না , বলার মূল কারণ হল বিহার এবং উড়িষ্যা'র সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নিবিড় আর্থসামাজিক যোগাযোগ । এই দুই রাজ্যের বহু নাগরিক কর্মসূত্রে এখানে থাকেন, লকডাউনের সময়ে ফিরে গেছেন এবং এখন আবার ফিরে  আসছেন। তাছাড়া সমগ্র পূর্ব ভারতে বহু পরিযায়ী শ্রমিক ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ভিড় ট্রেনে ফিরেছেন। অগণিত গ্রাম শহর শহরতলি গঞ্জে তাঁরা মিলিত হচ্ছেন। নিজেদের রাজ্যে  টেস্ট পর্যাপ্ত না হলে তাঁরা যখন পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসবেন তখন কিন্তু asymptomatic carrier বেড়ে যাবার আশঙ্কা থাকছে।  এই ব্যাপারে আমাদের রাজ্যকে সর্বস্তরে বৈজ্ঞানিক মতে সতর্ক হতে অনুরোধ করছি। 'ও কিছু হবে না' ভাবার সময় আসতে এখন বহু দেরি।  

অবশ্য, এ কথা স্বীকার করতেই হবে initial dilly-dally কাটিয়ে এই রাজ্য বেশ কিছুটা চেষ্টা করেছে এবং সেই জন্যেই আজ করোনা আক্রান্তদের  মধ্যে মৃতের সংখ্যাও কমেছে।  গোড়ার দিকে যতজন আক্রান্ত হচ্ছিলেন তাঁদের ১০% র বেশি মারা যাচ্ছিলেন! এটি একটি বিশাল সংখ্যা এবং বেশ আতঙ্কের কারণ ছিল। আজ কিন্তু সেই অবস্থা উল্লেখযোগ্য ভাবে বদলেছে।  গ্রাফ দেখুন। মে আর জুন মাসে ভারতের আর পশ্চিমবঙ্গের mortality rate (১০০ জন আক্রান্তের মধ্যে কতজন মারা গেলেন). পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তার ও স্বাস্থ কর্মীদের সাধুবাদ দিতেই হবে।  অনেক অসুবিধের মধ্যে তাঁরা আজ মৃত্যুহার কমাতে অনেকাংশে সফল।  

In fact, গতকাল (২১শে জুনের ) মৃত্যুহার দেখলে বোঝা যাবে আরো উন্নতি করেছে এবং এখন পশ্চিমবঙ্গের mortality rate  (৩.৯৯%). তুলনামূলক ভাবে দেখলে মহারাষ্ট্রে এই হার ৪.৬৭%, মধ্যপ্রদেশে ৪.৩৩%, গুজরাটে ৬.০৯% আর দিল্লীতে ৩.৬৪%.  আবার উল্টোদিকে কর্ণাটক (১.৫%), উড়িষ্যা (০.৩৭%)  সাফল্য উল্লেখযোগ্য।   

পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুহার কেন বেশি ছিল (বা এখনো আছে) সেটা একটা প্রশ্ন বটে।  উত্তর আমার জানা নেই, আর হাতে সেরকম ডিটেল পরিসংখ্যান ও নেই।  তবে লক্ষণীয় যে যে ৫৫৫ মারা গেছেন তাঁদের ৪১৩ (অর্থাৎ ৭৪% ) কলকাতা আর উত্তর ২৪ পরগনার বাসিন্দা - তার মধ্যে সল্টলেক আর রাজারহাট নিউ টাউন অঞ্চল, পড়ছে ।  হাওড়ায় আরো ৭৫ জন। আর কলকাতা, সল্টলেক, রাজারহাট নিউটাউন অঞ্চলের একটা বড় সংখ্যক নাগরিক যে বয়স্ক সেটা তো অজানা নয় - সেই জন্যেই তো অনেকে আজকাল কলকাতাকে 'পুরো শহরটাই তো old age home' বলে থাকেন ; এবং করোনা যে বয়স্কদের পক্ষে (বিশেষত যাদের অন্য কোন অসুখ আছে তাঁদের পক্ষে) বেশি  মারাত্মক সে তো সবাই জানি। সেটাই কি এইসব অঞ্চলে মৃত্যুহার বেশি হবার কারণ? সেই জন্যেই কি পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক মৃত্যুহার বেশি? হতে পারে .....

আগের তুলনায় মৃত্যুহার কমেছে কেন? 
আগের ব্লগে যা লিখেছিলাম তাই এখানে আবার তুলে দিচ্ছি - সম্ভবত দুটি কারণ - এক, আগে পরীক্ষা মূলত রুগী (এবং গুরুতর অসুস্থ রুগী) এবং তাঁর কাছাকাছি যাঁরা আছেন তাদের টেস্ট হচ্ছিল; তাই positive to death conversion বেশি ছিল।  এখন সামাজিক লেভেলে টেস্ট বেড়ে যাওয়াতে (এবং যেহেতু এই অসুখের ৮০%র বেশি এমনিতেই সেরে যান, ৯০%র বেশি হাসপাতালের ধারেকাছেও যেতে হয় না - এটা ভুললে চলবে না ) করোনা'য় মৃতের টোটাল সংখ্যা বাড়লেও সেই rate নিম্নগামী। দুই,  তাছাড়া, একটি নতুন অসুখ এলে সেটার গতিপ্রকৃতি বুঝতে কিছুটা সময় তো লাগেই। স্বাভাবিক, এত ম্যাজিক নয় রে বাবা, মছলিবাবাও নয় ! তাই, মনে হয়, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাজ্যের ডাক্তার ও স্বাস্থকর্মীরা এখন এই লড়াইয়ে আরো experienced হয়ে উঠেছেন।করোনা চিকিৎসার জন্যে নিয়োজিত বেড ও বেড়েছে - ৩১শে মে ৮৭৮৫টি বেড ছিল, আর এখন সেই সংখ্যা ১০৩৪০। তাই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত বেড আছে বলেই মনে হয়  (নীচে গ্রাফ দেখুন  - ৮০% মত বেড খালি পাওয়া উচিত; তবে কথা আর কাজে কতটা  ফারাক কি করে বলব ? ). 


প্রথম গ্রাফে ফিরে যাই।  আপনাকে স্ক্রল করতে হবে না , এই যে আবার দিয়ে দিলাম।  
মে মাসের গোড়ায় ratio বেশি ছিল, তারপর ভালোই কমছিল কমছিল কমছিল - ২০শে মে নাগাদ সর্বনিম্ন।  তারপর আবার বাড়তে আরম্ভ করল।  কি হল? আক্রান্ত কমে আবার বাড়তে আরম্ভ করল কেন? মনে করে দেখুন মে মাসের শেষের দিকে ঘটা দুটো কারণ প্রথমেই মনে আসে - এক, পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা। আর দুই, সাইক্লোন উমপুন্।  
দেখুন, ছোটবেলায় একটা খেলা খুব চলত - স্ট্যাচু! যেই বলা হবে অমনি দাঁড়িয়ে পড়তে হবে, নো নড়ন চড়ন ! লোকডাউনও তাই।  যে যেখানে সে সেখান থেকে নড়বে না। এ শহর থেকে ও শহর, এ রাজ্য থেকে ও রাজ্য, এ দেশ থেকে ও দেশ যাতায়াত বন্ধ। বন্ধ মানে বন্ধ। তবে যে দেশের ৮০% লোক মাস গেলে স্টেডি মাইনে পান না তারা তো খালি পেটে বসে থাকতে পারেন না, তাই অভিজিৎ ব্যানার্জি'র উপদেশ ছিল যে সবাইকে পর্যাপ্ত খাবার এবং মাসের খরচ চালাবার টাকা দিতে হবে। 
হল না।  রেশন কিছুটা এলেও টাকা সেভাবে এল না ।  কোন কোন রাজ্য অবশ্য চেষ্টা করেছিলেন নিজের তহবিল খরচ করে শ্রমিকদের যত্ন নেবার।  কিন্তু তারও তো একটা লিমিট আছে।  পশ্চিমবঙ্গ যেমন তার বকেয়া টাকা চাইছে অন্য সবাই ও তো চাইছে - পাচ্ছে না। কত করবে ? - সবারই তো নিজের  রাজ্যবাসীর কথা ভাবতে হবে আগে।  আর তার ওপর রেল-রাজ্য coordinate না হয়েই ভিড় ট্রেন চলতে আরম্ভ করল।কি আর বলবেন ? কথার কথা বলছি, একদিনে হয়তো ২০০০র শ্রমিকের টেস্ট করা যায়, থাকা খাবার ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু ১০০০০র যায় কি?  আপনাকে দায়িত্ব দিলে পারবেন? আমায় দিলে তো কাঁচকলা পারব। 

তার ওপর এল ঝড়। পরিযায়ী শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করতে অবস্থা টাইট, তারপর কয়েক কোটি বাঙালি ঘোর বিপদে পড়লেন।  সব মিলিয়ে যা হল ভাইরাসের যদি বোধবুদ্ধি থাকত তাহলে তো আনন্দে লাফাত,' লটারি পেয়েছি লটারি'!  

আর তাই আবার পরের গ্রাফগুলো দেখি। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কবে থেকে কতটা বাড়ল আক্রান্তদের সংখ্যা।  
একটা গ্রাফে সব জবরজং হয়ে যাবে বলে ৪টি গ্রাফ করেছি। আর কোনো কারণ নেই।  

প্রথম গ্রাফেই কলকাতা, হাওড়া ২৪ পরগনা।  আক্রান্ত মে মাসের গোড়া থেকেই যথেষ্ঠ। সে তো জানি - এপ্রিলেই বেশি ছিল।  

compare করুন উত্তরবঙ্গর সাত জেলা  ও মালদা,  মুর্শিদাবাদ , নদীয়া, বীরভূম, বাঁকুড়ার সঙ্গে।  প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা ২২ থেকে ২৭র মে'র পরেই বাড়তে আরম্ভ করছে।  

একই কথা প্রযোজ্য মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া , বীরভূম সবার জন্যে।  মে মাসের মাঝামাঝি অবধি নগন্য, ২২-২৭ মে'র পর থেকেই সংখ্যা বাড়ছে।  

ভাল কথা, যে হুগলি ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের অন্য জেলা এখনো যথেষ্ঠ কম।  

নজর করতে ভুলবেন না যে কলকাতা হাওড়া গ্রাফের Y-axis অনেক বেশি।  হাজার-দুহাজার-তিন হাজার।  অন্য জেলাদের ক্ষেত্রে সেটা এখনো ২০০-৩০০-৪০০.

তাহলে সব যোগ করে কি দাঁড়াচ্ছে - কলকাতা হাওড়া গোড়া থেকেই বেশি।  অস্বাভাবিক নয়।  যেখানেই যাতায়াত বেশি, জনসংখ্যার ঘনত্ত বেশি সেখানেই বেশি - যেমন মুম্বই, দিল্লী, আমেদাবাদ, চেন্নাই (ফেব্রুয়ারি মাসে সব এয়ারপোর্ট বন্ধ করে দিলে কি এই দুর্দিন আজ আসে??) .  কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের বহু জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে মে মাসের শেষ থেকে।  এর সঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার যোগাযোগ থাকার ভালোই সম্ভাবনা।  তার মানে ঠিক যখন এই রাজ্য টুকটুক করে হলেও কোরোনাকে একটু বাগে আনছিল, তখনই কেসটা কেঁচে গেল।  আর তাছাড়া, আমার ধারণা, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সংখ্যা আরো বাড়বে আগামী দিনে। উমপুন্ ঝড়ে যে ভয়ঙ্কর ভাবে রাস্তাঘাট-জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার প্রভাব টেস্ট ও চিকিৎসার ওপর পড়তে বাধ্য।  আর তাছাড়া জেলায় জেলায় টেস্টিং সেন্টার পুরোদমে কাজ করতে শুরু করলে সংখ্যা কিছুটা বাড়বে।  স্বাভাবিক। 

প্রসঙ্গত, ওপরের গ্রাফে যেটা নজরে পড়ে সেটা হল উড়িষ্যার %ও কিন্তু মে মাসের শেষে বাড়তে আরম্ভ করেছে।  কারণ সম্ভবত একই - পরিযায়ী শ্রমিক।  বিহার অবশ্য কমেছে। সেটা সাফল্য হতেই পারে।  কিন্তু কি করে? বহু পরিযায়ী শ্রমিক তো বিহারে  ফিরেছেন, তাই না ? এর সঙ্গে কম টেস্টের কোন যোগ আছে কি?  .....টেস্ট সংখ্যা আরো অনেক বেশি হলে নিশ্চিত হওয়া যেত।  

শেষের কথা: 
তবে এসবে তো ভিরমি খাবার কিছু হয়নি। অসুখ যদি হয় ও, নিয়ম মেনে চললে, ৯৫% র বেশির যে সেরে যাবেই সে তো দেখায় যাচ্ছে। বিপদের দিনে বাঙালি হয়ে বাঙালির পাশে না দাঁড়ালে আমরা সবাই এতদিন কি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-চিত্তরঞ্জন-বিবেকানন্দগিরি করলাম ?  তবে হ্যাঁ, কাজটা আরো অনেক কঠিন হয়ে গেছে।  সে তো গেছেই।  দুম করে ব্যবসাপত্র রোজগার সব তুলে দিয়ে , লক্ষ লক্ষ লোক ভিড় ট্রেন বা কয়েকশো মাইল হাঁটছেন - টোটাল unplanned ভাবে এভাবে ছড়িয়ে লাট না করলে ভারত আজ 'করোনা কাপের' শেষ চারে উঠে যায় ??!! 


পশ্চিমবঙ্গ যে এখনো কমের ওপর আছে সে তো দেখাই যাচ্ছে। কে জানে? হয়তো এত দোষের মধ্যেও আমাদের critical attitude রাজ্যকে কিছুটা সাহায্য করেছে। আশা করছি আহমেদাবাদ মুম্বাই দিল্লী র মত অবস্থা এখানে হবে না - জানি না  ...... তবে একটা কথা বলে শেষ করি।  গতকাল রাত্রে একটা মজার খবর পড়লাম।  গত দু তিন সপ্তাহ আমেরিকায় যে প্রচুর বর্ণবিদ্বেষ আন্দোলন হচ্ছে সবাই পড়েছি।দারুন, হওয়া উচিত। তবে ,অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে  এইসব মার্কিন মিছিল মিটিংয়ে র জন্যে করোনা বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।  কারণ, মিছিল মিটিং মানেই তো ভিড়।  কিন্তু, সর্বশেষ তথ্য দেখে মনে হয় না মিছিল মিটিংয়ের জন্যে নতুন করে রোগ ছড়িয়েছে।  মানে, আমেরিকায় তো করোনা মহামারী পুরোদমে চালু আছে, কিন্তু মিছিল মিটিংয়ের জন্যে সেটা আর নতুন করে বাড়েনি।  
মানে, হিসেব মত বাড়ার কথা কিন্তু বাড়েনি।  কি করে হল? ফেলুদার কথায়, 'যা খুঁজছিলাম  তা পাইনি, এবং সেটাই সিগনিফিকেন্ট'।বিজ্ঞানীরা তাই খুঁটিয়ে দেখেছেন। এবং একটা সহজ সরল সত্য আবার সামনে এসেছে - ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে প্রতিবাদ মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারীরা প্রায় সবাই ভাল করে, যত্ন করে মাস্ক পরেছিলেন। এটাই অবশ্য শেষ কথা নয়, কিন্তু করোনার সঙ্গে লড়তে মাস্ক যে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাতে কোন সন্দেহ নেই।  

দেখুন সোজা হিসেবে,  ভিড় বাস, ট্রেন,  ভিড় বাজার করতে আমাদের বেরোতেই হবে। অভিজিৎ বাবুর কথা মেনে যদি (সুইস ব্যাঙ্ক থেকে ১৫ লাখ না হোক) নিজেদের RBI থেকেই টাকা পাওয়া যেত তাহলে হয়ত আমাদের কম বেরোতে হত, কিন্তু সে তো আসেনি, আসবেও না মনে হয়। হাতে আছে মাস্ক। মাস্ক মাস্ক মাস্ক।  এ ছাড়া গতি নেই। AIDS মহামারী রুখতে যেমন কন্ডোম, করোনা মহামারী থেকে বাঁচতে তেমন মাস্ক।  মাস্ক ভালো করে পড়তে হবে, রেগুলার পড়তে হবে, বাড়ি ফিরে সাবান দিয়ে কেচে দিতে হবে , আর হাতে হেলমেটের মোট থুতনিতে মাস্ক পরে কেত মারলে চলবে না।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল SCIENCEএ প্রকাশিত একটি ডায়াগ্রাম দিয়ে শেষ করি।  ভাল থাকবেন। মাস্ক পরবেন, পরতে বলবেন।  
  



তথ্য: 


Friday, June 12, 2020

OUTRAM, NETAJI AND THE HORSE 

The recent outburst in the USA and Europe for removing and branding statues of (in)famous people - Edward Colston, Winston Churchil, Robert Milligan, Leopold II - whose actions associate themselves well with racism and colonization reminds of an factoid from the not-so-old history of my city, Calcutta. Its the tale of a statue that was removed and one that came up later.

Ask any Calcuttan, 'Heard of Outram?' and the most-likley answer will be 'Outram? after whom outram ghat is named?' Yes. One of the city's old riverbank ghats is named after the now almost-forgotten Outram. Who was he?

Well, General James Outram was one of the British icons of the 19th century. A noted military commander and colonial administrator (who didn’t hesitate to expose corruption of british officials!) , he played an important part in expanding British rule in the subcontinent in the 1840s-50s. He had a decisive role in the annexation of Sindh and later of Awadh (remember Sir Richard Attenborough's superb performance in Satyajit Ray's Shatranj ke Khiladi?' thatz Outram) .

 But, what endeared Outram to the British people was his decisive role in turning the tide of the 1857-rebellion. As the British desperately tried to restablish their rule, Outram was one of their most successful generals, especially at Lucknow. It was he who forced Nana Saheb to retreat - a decisive step that finally led to British victory. That wasn't all. By mid-1858, Outram's army had chased the Indian rebels all over central India and practically broken the back of the resistance.

The British weren’t hesitant in acknowledging his contribution to their profits. They commissioned the noted sculptor John H. Folli to build an equestrian statue in his honour. Thus, in 1874, General Outram - seated on his stallion- was installed at their ‘2nd capital of the empire’, Calcutta – at the junction of Chowringee Road and Park Street, close to his once-headquarters at Fort William and not far from the city center of Esplanade.
And there he stood (or galloped) for more than 70 years. Till 1947.



But colonialism had ended and so it was time for its icons to go too, at least from public view. In the 1950s, the WB government embarked on a ‘serious’ decolonization initiative after independence and several ‘firangi’ statues that dotted Calcutta were removed. Outram too was un-seated and by none other than the Mahatma, whose statue came up there in 1958 (today, of course, the same Gandhi has been placed at the Mayo Road-Dufferin Road junction).



All that is patriotic and very fine. But, now comes a bit of desi remix. and a rather awkward one.
In 1967, the Calcutta Corporation (today CMC) was decided to honour the city’s most charismatic hero (and ex-Mayor), Netaji Subhas Chandra Bose. And, at the northern part of the city, at the 5-roads junction called Shyambazar Crossing, they erected an equestrian statue in his honour. Now, thatz doubly-good and should make our chests pump up beyond 56 inch. The only trouble is that, for reasons unknown, sculptor Nagesh Jogalkar made a direct copy of the Outram-on-horse statue!!!??

I personally think the Netaji statue itself is a rather unaesthetic one. Its location is rather 'ugghh' too, especially with the cobweb of tram cables all around. And the horse’s gravity-defying tail is a marvel of physics!!!!



But, besides all that, the spirit of Netaji must be quite sad that, after a lifelong struggle against the British empire, his statue had to be made identical to a colonial general! We Indians....aahhhhh!!!

PS: As for Outram, he was transferred to the premises of the Victoria Memorial – thus continuing to serve his Queen. And there he now stays, in quiet neglect, but providing a bit of space to those who have found love and warmth in the fast-moving metro.



(ref: Debraj Goswami’s post at fb https://www.facebook.com/groups/admin54/permalink/1449690395095724/;
pics: google, https://www.telegraphindia.com/culture/therein-hangs-a-tail/cid/1729181 )

Sunday, May 31, 2020

পশ্চিমবঙ্গের করোনা লড়াই - 
মে মাসের পরিসংখ্যান বলছে উন্নতি করেছে, কিন্তু  ....
(করোনা বিজ্ঞানের খুচরো খবর - ১০)

আপনাদের হয়েছে কিনা জানিনা, কিন্তু আমি সকাল সন্ধ্যে টিভিতে ওই 'ডাকাত পড়েছে রে '-মার্কা করোনা'র খবর দেখে (দেখিও না, কিন্তু কানে তো ঢুকছে) বিরক্ত হয়ে গেছি।এমন করে হেঁড়ে গলায় হেডলাইনে বলে যেন কোন করোনা আক্রান্ত একজন দাগী অপরাধী! আর তারপর যেন কম্পিটিশন - কে কত সংখ্যা বলতে পারল আজ। যেন আইপিএল'র খেলা হচ্ছে, রান বাড়ছে।ব্যাস, হয়ে গেল, আর কোন তথ্য নিয়ে আলোচনা নেই।আর সেই অবৈজ্ঞানিক horror story-type উপস্থাপনা দেখে সবাই ভয়ে জুজুবুড়ি হয়ে শুরু করল 'কি হবে কি হবে' ! ভয়ে হার্টফেল করে যাবার জোগাড় !   লক্ষ্য করে দেখবেন, এর জন্যে কিন্তু লোকজন  বেশ বেশি ভয় পেয়ে আছেন।

তাই ভাবলাম,  রাজ্যের covid পরিস্থিতির তথ্য একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক। যতটা সম্ভব চলিত ভাষায় লিখে আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করা যাক। তথ্য সব তো পাবলিক ডোমেনেই আছে। অবশ্য, আমি স্টাটিস্টিশান নই, এপিডেমিওলোজিস্টও নই, সেই M.Scর সময়ে এপিডেমিওলজি পড়েছিলাম বটে, এখন কিছুটা ভুলেও গেছে।  তাই বেশি ডিটেলে যাব না। কিন্তু কিছুটা তো বের করে সহজভাবে আপনাদেরও সঙ্গে শেয়ার করাই যায়। তারপর বিশ্বাস-অবিশ্বাস-যুক্তি-তর্ক-গপ্পো, আমার লেখার মধ্যে আমরা- ওরা রাজনীতি খোঁজা আপনার ব্যাপার। সে করবেন করুন, আমার কিছু বলার নেই ।আমার 'নেই কাজ তো খই ভাজ' কাজ হল পশ্চিমবঙ্গের covid-১৯ সংক্রান্ত কিছু তথ্য  শেয়ার করা।

১. গত মাসের মাঝামাঝি অভিযোগ ওঠে যে রাজ্যে টেস্ট অনেক কম হচ্ছে। এই নিয়ে প্রচুর চাপানউতোর চলে, রোগ চাপার অভিযোগ আসে, অকেজো কিট সাপ্লাই হয়েছে সেটা কিছুটা স্বীকারও হয়,  '১৮ না ৫৭' নিয়ে চেঁচামিচি চলে, ইত্যাদি। তারপর এক মাস কেটে গেছে। দেখা যাচ্ছে, ৩০শে  এপ্রিল অবধি রাজ্যে টেস্ট হয়েছিল ১৬,৫২৫, আর আজ ৩০শে মে টেস্ট হয়েছে ১ লক্ষ ৮৫ হাজারের কিছু বেশি। এবং যেখানে এক মাস আগে টেস্ট হত দিনে ৪০০-৫০০, সেখানে আজ ৯,০০০র বেশি পরীক্ষা হচ্ছে (ছবি ১)। এমনকি উমপুন্ সাইক্লোনের দিনেগুলিতেও ৪-৫ হাজার পরীক্ষা হয়েছিল।উন্নতি অনস্বীকার্য।
ছবি ১: ৪ঠা মে থেকে ৩০শে মে অবধি রাজ্যে প্রতিদিন কত করে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে।  
ল্যাবের সংখ্যাও বেড়েছে।  ৪ঠা মে ১৬টি ল্যাব টেস্ট করছিল, আর আজ করছে ৪০টি।  এদের মধ্যে সিংহভাগ সরকারি।এবং তাই, গত মাসে যেখানে পশ্চিমবঙ্গে টোটাল টেস্টের সংখ্যা প্রায় সব রাজ্যের তুলনায় কম ছিল, আজ টেস্টের পরিসংখ্যানে এই রাজ্য চড়চড় করে ওপরের সারিতে উঠে এসেছে  (ছবি ২)। প্রসঙ্গত বলি, গত মাসে যখন কয়েকজন বন্ধুকে বলেছিলাম যে কম টেস্ট হচ্ছে bad science and bad public relations তখন তারা বেশ চোটে গেসল।  আজ এই প্রশংসনীয় উন্নতি দেখলে জানি তাদেরও ভালো লাগবে। 
ছবি ২: বিভিন্ন রাজ্যে সব মিলিয়ে কত করোনা পরীক্ষা হয়েছে।  

২. এর সুফল ও পেয়েছেন  রাজ্যবাসী।  কারণ, গত এক মাসে positive/test ratio (অর্থাৎ কটা টেস্ট হল আর তার মধ্যে কটা পসিটিভ এল ) ৫.০১% থেকে নেমে হয়েছে ২.৬৪% (ছবি ৩). এর থেকে দুটি ব্যাপার conclude করা যেতে পারে।  এক, আগে  মূলত রুগী (এবং গুরুতর অসুস্থ রুগী) এবং তাঁর কাছাকাছি যাঁরা আছেন তাদের পরীক্ষা হচ্ছিল।  তাই পসিটিভ বেশি ছিল। কিন্তু,  এখন আক্রান্ত খোঁজার জন্যে টেস্ট আরো বাড়ানো হয়েছে এবং খুব সম্ভবত মহারাষ্ট্র, গুজরাটের ও দিল্লীর মত এখনো এখানে ভাইরাস  সমাজে খুব বেশি ছড়িয়ে পড়েনি। তাই, অনেকের জ্বর সর্দি কাশি হলেও টেস্ট করলে দেখা যাচ্ছে তিনি নতুন করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত নন, রেসাল্ট নেগেটিভ আসছে আর ওই ratio কমে যাচ্ছে।
ছবি ৩: পশ্চিমবঙ্গে কত টেস্ট হয়েছে তার মধ্যে করোনা আক্রান্ত (পসিটিভ) ক'জন?  মে মাসের হিসেবে। করোনা আক্রান্তের % বেশি হলে গ্রাফ উর্ধমুখী, কমতে থাকলে নিম্নগামী। 

৩. উল্লেখযোগ্য যে মে মাসের গোড়ায় রাজ্যের এই ratio ভারতের গড় ratioর থেকে  বেশি ছিল।   কিন্তু মাসের ১৪-১৬ তারিখ নাগাদ থেকে তা কমেতে শুরু করে এবং আজ সেটা ন্যাশনাল গড়ের তুলনায় অনেকটাই কম -২.৬৪% vs ৬.৫% (ছবি ৪) ।
ছবি ৪:  পশ্চিমবঙ্গে আর ভারতে কত টেস্ট হয়েছে তার মধ্যে করোনা আক্রান্ত (পসিটিভ) ক'জন?  মে মাসের হিসেবে। করোনা আক্রান্তের % বেশি হলে গ্রাফ উর্ধমুখী, কমতে থাকলে নিম্নগামী। 

শুধু তাই নয়, বেশি পরীক্ষা হবার ফলে গত একমাসে এই রাজ্যের tests per million (অর্থাৎ প্রতি দশ লক্ষ জনসংখ্যার কতজনের টেস্ট হয়েছে) সেটাও লাগাতার বৃদ্ধি পেয়েছে (ছবি ৫)।  সোজা কথায়, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় ভারতের অনেক রাজ্যে করোনা-আক্রান্ত  সংখ্যা বেশ বেশি, এবং পশ্চিমবঙ্গে 'খুব কম পরীক্ষা হয়েছে তাই আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না' এই অভিযোগ আর আগের মত অতটা খাটে না।  অবশ্য, এর মধ্যে কিছু টেস্ট আছে যেগুলি যাঁরা আক্রান্ত তাঁদের re-টেস্ট করার সময় করা হয়েছে। শুনেছি, চিকিৎসাধীন থাকার সময় দুটি টেস্ট করা হয়।কিন্তু exact re-test সংখ্যা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। যাই হোক, এতে কোন সন্দেহ নেই যে আগের থেকে অনেক বেশি টেস্ট হয়েছে এবং তা সত্ত্বেও এই পরিসংখ্যান রাজ্যের পক্ষে আশাব্যাঞ্জক।

ছবি ৫: প্রতি ১০ লক্ষ্য জনসংখ্যায় কতজনের করোনা পরীক্ষা হল? এই রাজ্যের মে মাসের হিসেবে।উন্নতি করেছে।   

৪. বিজ্ঞানী, টেস্ট সেন্টারের কর্মী, ডাক্তার, চিকিৎসাকর্মী, কর্পোরেশনের কর্মী (যাঁরা রোজ এখন বাড়ি-বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন) - এঁদের সবার যৌথ প্রচেষ্টা যে গত মাসের 'পথ ভোলা পথিক' attitude থেকে পশ্চিমবঙ্গকে ফিরিয়ে এনেছে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে, এতে আত্মতুষ্টি'র কোন কারণ নেই। তার একটি কারণ  - রাজ্যের tests per million বাড়লেও অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় তা এখনো কম (ছবি ৬)।
ছবি ৬: প্রতি ১০ লক্ষ্য জনসংখ্যায় কতজনের করোনা পরীক্ষা হল? সব রাজ্যের পরিসখ্যান।   

এর একটা কারণ অবশ্য রাজ্যের জনসংখ্যা - আয়তনে ছোট রাজ্য হলেও, এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম হলেও, মোট জনসংখ্যা'র বিচারে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের চতুর্থ। তাছাড়া, বেশ কিছু রাজ্য টেস্ট বিষয়ে গোড়া থেকেই সচেতন ছিলেন, এবং তাই তাঁরা আজ tests per millionএ এগিয়ে। সে তো ভালোই। এক সূত্রে গাঁথা আমরা সবাই,  আর ভাইরাসের গতি-প্রকৃতি বুঝতে  সবার রেসাল্ট সবার কাজে আসছে - প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে। কিন্তু, যতটা সম্ভব কম খরচে নিপুন ভাবে অনেক টেস্ট করে যেতেই হবে।  ভাইরাস কোথায় আছে সেটা দেখতে এই টেস্ট হল আমাদের 'চোখ'। এও মনে রাখতে হবে টেস্ট হল 'টেস্টিং এবং ট্রেসিং'র অন্তর্গত। epidemiologyর নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট করলে কম সংখ্যক টেস্টেও একটি রাজ্য করোনা যুদ্ধে বেশি সফল হতে পারে - বেস্ট প্রমান এখন কেরলা।

৫. আচ্ছা, টেস্ট তো হচ্ছে - কিন্তু সংখ্যা তো বেড়েই চলেছে? রাজ্যে কতজন করোনা আক্রান্ত ? টা আমাদের সবারই একটা বড় প্রশ্ন।  এবং এই মিথ্যে-সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে কতরকম গাঁজা যে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই।  দেখুন,প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে এই সংখ্যা সঠিক ভাবে কেউ জানে না , জানলে তো টেস্ট করতেই হত না। কিন্তু,বিজ্ঞানভিত্তিক কিছুটা আন্দাজ করা যায়।কোথা থেকে ? অনেকভাবে theoretical modeling করা যায়, কিন্তু একটা সোজা উপায় হল  করোনায় আক্রান্ত হয়ে কতজন মারা গেছেন সেই হিসেব থেকে।

প্রশ্ন ১:  দেশে যতজন আক্রান্ত  তাঁদের মধ্যে কত শতাংশ মারা গেছেন (করোনা-আক্রান্ত আর co-morbidity যোগ করে )? উত্তর - ২.০৫% . 
প্রশ্ন ২: সব রাজ্যে কি এই একই  শতাংশ প্রাণ হারিয়েছেন? উত্তর - না।  কোন কোন রাজ্যে ১% র কম লোক মারা গেছেন।  কোথায় সেই সংখ্যায় জাতীয় গড় ২% আশেপাশে, কোথাও ৩% র ওপরে। ব্যতিক্রম দুটি রাজ্য - গুজরাট এবং পশ্চিমবঙ্গ, যাঁদের দুজনেরই covid-19 mortality rate (i.e. death/positives) ৬% র বেশি।  গুজরাটে কি হয়েছে সেই আলোচনায় যাব কিনা, কিন্তু এই  রাজ্যের আরেকটা পরিসংখ্যান দিই - 

৪ঠা মে - রাজ্যে টোটাল আক্রান্ত ১২৫৯ জন, মারা গেছেন ১৩৩ জন।  mortality rate ১০.৫%. 
১১ই  মে - রাজ্যে টোটাল আক্রান্ত ২০৬৩ জন, মারা গেছেন  ১৯০ জন।  mortality rate ৯.২ %. 
১৮ই মে - রাজ্যে টোটাল আক্রান্ত ২৮৪৫ জন, মারা গেছেন  ২৪৪ জন।  mortality rate ৮.৬ %. 
২৫শে মে - রাজ্যে টোটাল আক্রান্ত ৩৮১৬ জন, মারা গেছেন  ২৭৮ জন।  mortality rate ৭.২ %. 
৩০শে মে (গতকাল)- রাজ্যে টোটাল আক্রান্ত ৫১৩০ জন, মারা গেছেন  ৩০৯ জন।  mortality rate ৬ %. 

তার মানে পশ্চিমবঙ্গের mortality rate একসময় আজব রকমের বেশি ছিল।  পৃথিবীর সব দেশের average mortality rateর দেড়গুণ! এ আবার হয় নাকি ? তাহলে কি 'পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক কোরোনাভাইরাস একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই এসেছে'? না  'এই রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা সবচেয়ে সবচেয়ে সবচেয়ে খারাপ' ??!! এইসব আষাঢ়ে গপ্পো ফেলে দিন, কারন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, যবে থেকে টেস্ট সংখ্যার উন্নতি হয়েছে এই রাজ্যে মৃত্যুহারও উল্লেখযোগ্য ভাবে steadily কমেছে। কি ব্যাখ্যা দেবেন? সম্ভবত দুটি - এক, আগে পরীক্ষা মূলত রুগী (এবং গুরুতর অসুস্থ রুগী) এবং তাঁর কাছাকাছি যাঁরা আছেন তাদের টেস্ট হচ্ছিল; তাই positive to death conversion বেশি ছিল।  এখন সামাজিক লেভেলে টেস্ট বেড়ে যাওয়াতে (এবং যেহেতু এই অসুখের ৮০%র বেশি এমনিতেই সেরে যান, ৯০%র বেশি হাসপাতালের ধারেকাছেও যেতে হয় না - এটা ভুললে চলবে না ) করোনা'য় মৃতের টোটাল সংখ্যা বাড়লেও সেই rate নিম্নগামী। দুই,  তাছাড়া, একটি নতুন অসুখ এলে সেটার গতিপ্রকৃতি বুঝতে কিছুটা সময় তো লাগেই। স্বাভাবিক, এত ম্যাজিক নয় রে বাবা, মছলিবাবাও নয় ! তাই, মনে হয়, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাজ্যের ডাক্তার ও স্বাস্থকর্মীরা এখন এই লড়াইয়ে আরো experienced হয়ে উঠেছেন। আমরা তাঁদের কাছে ঋণী।

৬. আচ্ছা, রাজ্যে ৬%ই বা কেন? এটাও তো এখনো যথেষ্ট বেশি । সত্যি, এর উত্তর আমার জানা নেই, আর তেমন খুঁটিয়ে পরিসংখ্যান দেখিনি।  তবে , একটা hypothesis দিতে পারি। যাঁরা মারা গেছেন তাঁদের ৬৫% কলকাতাবাসী। এদ্দিনে আমরা জেনে গেছি যে এই অসুখ মূলত বয়স্কদের জন্যে fatal, এবং কলকাতা শহরটা যে অনেকটা 'বৃদ্ধাশ্রম' হয়ে গেছে সেটা কি আমাদের অজানা ? এই সামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে করোনায় মৃত্যুর একটা যোগাযোগ থাকলে অবাক হবেন না।

৬. তাহলে এবার আগের প্রশ্নে ফিরে যাই।  রাজ্যে কতজন করোনা আক্রান্ত?  দেশের মৃত্যুহার ২.০৫% ধরলে  (৩০৯/২.০৫)x ১০০ = ১৫ হাজারের কিছু বেশি।  যদি রাজ্যের মৃত্যুহার ধরে হিসেবে করেন তাহলে (৩০৯/৬)x ১০০ = ৫১৫০ (যে সংখ্যা আজই অতিক্রান্ত হবে, সুতরাং হতে পারে না ) । তার ওপর মহামারীর হিসেবে ঠিক পাটিগণিতের সহজ পথে চলে না। তবে, এই দুই সংখ্যার মাঝামাঝি ধরলে বলতে হয় আজ অবধি হয়ত ১০ হাজার পশ্চিমবঙ্গবাসী আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৫০০০র কিছু বেশি সন্ধান পাওয়া গেছে টেস্ট করে, অনেকে কোয়ারেন্টাইন হয়েছেন, অনেকে হাসপাতালে।  বাকিদের দ্রুত খোঁজাই হল আসল কথা। কারন, তাঁদের মধ্যে ৭০%র বেশি জানেন ও না যে তাঁরা আক্রান্ত।  এবং তাই তাঁরা এই ভাইরাসের মূল ধারক-বাহক।  

৭. এই  বিষয়ে আরেকটা সংখ্যা দেখা যাক। প্রতিদিন কত টেস্ট হয়, এবং তাতে প্রতিদিন কতজন নতুন আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া যায়? এই গ্রাফটা দেখুন (ছবি ৭) - Y axisএ positives/tests PER DAY. গ্রাফটা ওঠা-নামা করছে বটে (সেটা স্বাভাবিক, দিনকে দিন variation যে কোন বৈজ্ঞানিক তথ্যেই হয়ে থাকে; না হলেই সন্দেহজনক), কিন্তু মে'র প্রথমদিকে যত জন আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া যেত ১০-১১র তারিখের পর থেকে একই সংখ্যার টেস্ট করলেও তার থেকে অনেক কম পাওয়া  গেছে। তার মানে রাজ্য কিন্তু রোগের ছড়িয়ে পড়া কিছুটা হলেও আটকেছে ।
ছবি ৭: প্রতিদিন কত টেস্ট এবং প্রতিদিন কজন নতুন করে আক্রান্ত।  মে মাসের পরিসংখ্যান।  কমছিল, কিন্তু এবার কি সাইক্লোন আর শ্রমিকদের ফেরায় উর্ধমুখী? 

আমার  ধারণা এই ratio আরো নিচে নামতো। বাধ সাধল দুটি ঘটনা - ঘূর্ণিঝড় উমপুন্ আর ক্লান্ত শ্রান্ত শ্রমিকদের অমানুষিক কষ্ট করে বাড়ি ফেরা। মানুষ বিপদের দিনে, খাবার-দাবার থাকার জায়গা, পকেটে পয়সা না থাকলে বাড়ি ফিরবেই; আমি-আপনি হলেও তাই করতাম। আর ঝড় তো আমাদের নাগালের বাইরে।  এই দুই  থেকে করোনা লড়াইয়ে যে ক্ষতি হল তার আন্দাজ সম্ভবত আমরা এই এখন বুঝতে শুরু করব।আশাকরি আমার এই লেখা যেন ভুল প্রমাণিত হয়, তবে লক্ষ্য করুন গ্রাফ কিন্তু আবার অল্প হলেও চড়তে আরম্ভ করেছে  .....অবশ্য এটাও  শুনেছি, যে অনেক জেলায় নতুন টেস্ট সেন্টার তৈরী হচ্ছে। খুবই প্রয়োজনীয় - শুধু কলকাতা-based টেস্টিং তো কমাতেই হবে।  অবশ্য, তার সঙ্গে সংখ্যাও বাড়বে।চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক তবে, আঁতকে ওঠার কিছু নেই - দু মিনিট আগেই তো দেখলেন অন্তত আরো ৫০০০ আক্রান্তের সন্ধান পেতে হবে।

৮. জানি, এসব দেখে কেউ কেউ বলবেন এসব তথ্য ভুলভাল।  সেই ক্ষেত্রে তাঁরই প্রমানের দায়িত্ব কেন তথ্যগুলি ভুল, এবং তিনি অন্য কোন data source ব্যবহার করছেন। সে যে বলবে তার ব্যাপার। বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে সব জিনিসেই আমার একটা healthy skepticism আছে (এই সন্দেহবাতিকের জন্যে আমার রাজনীতি-করা বন্ধুরা বেশ ক্ষেপে যায় ), এবং সারা পৃথিবীই যে নানা ভাবে 'গুপী' দিচ্ছে এটাও অনেকেই সন্দেহ করেছেন। কিন্তু, তাই বলে 'সব বাজে' বলে ফেলে দেব বা শুধু এই রাজ্য মিথ্যে আর সবাই যুধিষ্ঠির প্লাস হরিশ্চন্দ্র তা তো হয় না। তাহলে তো বলতে হয় 'সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে '।

৯. যাক সে কথা।  যেটা বলে শেষ করি - এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লকডাউন চলবে না তুলে নেওয়া হবে এই নিয়ে নানা মতামত।  দেখুন, বেশি কথায় যাব না, কিন্তু ন্যাশনাল লেভেলে লকডাউন খুব যে আশাপ্রদ হয়নি সে তো ৬০০০-৭০০০-৭৫০০-৮০০০ সংখ্যাই বলে দিচ্ছে। কিন্তু, ভাইরাস না কমুক মানুষের রোজগার তলানিতে এসে ঠেকেছে। একটা ছোট্ট রেগুলার মাইনে-পাওয়া ক্লাস ছাড়া এটা সবার ক্ষেত্রে কম-বেশি সত্যি (তাদের ও পুরো মাইনে কতদিন আসবে একটু সন্দেহ আছে, টাকা তো অর্থনীতির-সাইকেলে ঘোরে। সেই সাইকেল বন্ধ হলে আসতেই থাকবে না কি?....) ৭০ দিন হতে চলল , কম তো নয়।  এই অবস্থায় আমরা সবাই 'গণশত্রু' আর 'অশনি সংকেত'র মাঝামাঝি পড়েছি ।  এবার কোন দিকে যাবেন? -

a) লক ডাউন উঠে গেল, রোজগারপাতি শুরু হল,  খাবার-দাবার বেটার হল, কিন্তু কোরোনাও বাড়তে আরম্ভ করল, b) লক ডাউন চলল আরো কয়েক সপ্তাহ বা মাস।  করোনা হয়তো কমল , কিন্তু রোজগার ? আর অনাহার? ...মনে রাখতে হবে, দুর্বল আধপেটা শরীরে রোগ সহজেই বাসা বাঁধে।  তাহলে? .....

অবশ্য আরেকটা option আছে।  তবে সে আর আমি নতুন কি বলব?  সদ্য নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ এবং অন্যান্য এক্সপার্টরা যা বলছেন সেসব করলে তো খুবই ভাল হয়। .....

পুনশ্চ : একটা গল্প বলি, অনেকেই জানেন অবশ্য ।  ৩০০০ বছর প্রাচীন হোমারের মহাকাব্যে নায়ক উলিসিস'র জাহাজকে সমুদ্রের এমন একটা জায়গা দিয়ে যেতে হয়েছিল যার একদিকে ছিল ক্যারিবিডিস দৈত্য আর অন্যদিকে ছিল স্কাইলা দানব। উলিসিস পড়েছিল ঘোর বিপদে। কারণ,  স্কাইলাকে এড়াতে গেলে ক্যারিবিডিস জাহাজ ডুবিয়ে দেবে, আর ক্যারিবিডিসকে কাটাতে গেলে স্কাইলা ছোঁ মেরে কয়েকজন নাবিককে তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলবে। সেখান থেকেই অমর হয়ে গেছে ইংরিজিতে phrase - between Scylla and Charybdis, between devil and the deep sea. উভয় সঙ্কট। ......আমাদের অবস্থা অনেকটা তাই।  ইশশ! ফেব্রুয়ারি মাসে যদি আমরা দেশের ২০টা এয়ারপোর্ট যদি বন্ধ করে দিতাম । .....

ভাল থাকবেন। আর ভাল করে মাস্কটা পড়বেন।  থুতনিতে নয়! ও আবার কি? হাতে হেলমেট ঝুলিয়ে বাইক চালাবার মত ....পাকামি !?

তথ্য:

https://www.covid19india.org/

https://www.wbhealth.gov.in/pages/corona/bulletin

https://ourworldindata.org/







Wednesday, May 20, 2020

কোরোনাভাইরাস - বিবর্তনের আশ্চর্য ফসল না গোপন অস্ত্র ?- দ্বিতীয় কিস্তি 


(আগের ব্লগের থেকে চলছে) ....

চন্দন: ৯৬% তো জেনেটিকালি বেশ ভালো মিল রে !

নন্দন: সে আর বলতে।  এই দিক ওই সব ভাইরাসদের বংশের ডালপালা (ছবি ১)।  লক্ষ্য কর, বাদুড়ের RaTG13 ভাইরাস কিরকম উহানের রুগীদের শরীরে যে নতুন কোরোনাভাইরাস পাওয়া গেসল ঠিক তার পাশেই। একদম নিকট আত্মীয়।
ছবি ১: বিটাকরোনা ভাইরাস বংশ। 
উহানের রুগীদের শরীর থেকে পাওয়া নতুন ভাইরাসের ঠিক পাশেই বাদুড়ের RaTG13 ভাইরাস। Zhou, P. et al (2020)  Nature. 579, 270-273 থেকে নেওয়া। 

চন্দন: তাহলে তো মিলেই গেল।

নন্দন:  না না।  অত অল্পতে বিজ্ঞানীরা সন্তুষ্ট হন না ।  পিকচার অভি বাকি হয়, মেরে দোস্ত। মনে আছে নিশ্চয়ই বললাম যে নতুন কোরোনাভাইরাসের জিনোমের সঙ্গে বাদুড়দের RaTG13 ভাইরাসের জিনোম ৯৬% মেলে, আর ২০০২র প্রথম সার্স ভাইরাসের সঙ্গে ৭৯% মেলে। ভালো কথা, তবে মনে রাখতে হবে এগুলো হচ্ছে পুরো জিনোমের জন্যে গড় বা অ্যাভারেজ সংখ্যা।  মানে, যদি নতুন ভাইরাস আর RaTG13 ভাইরাস দুজনের জিনোমের সাইজ হয় ১০০ নিউক্লিওটাইড তাহলে তাদের মধ্যে ৯৬টা নিউক্লিওটাইড এক , identical.

চন্দন: বুঝেছি। আর নতুন ভাইরাস আর প্রথম সার্স ভাইরাসের মধ্যে ৭৯টা নিউক্লিওটাইড মিলে যাবে।

নন্দন: হ্যাঁ , কিন্তু এবার প্রশ্ন হচ্ছে জিনোমের ওসব জায়গায় কি equally এই মিল থাকবে নাকি কোনো যায় ৯০%, কোনো জায়গায় ৬৫% হবে?  সেটা কিন্তু গড় দেখে বোঝা যাবে না।  একটু তলিয়ে দেখতে হবে।

চন্দন: হুম।  বুঝেছি। ডিটেলে অনেক জিনিস ধরা পড়ে।

নন্দন: ঠিক তাই।  এই গ্রাফটা দেখ (ছবি ২) ।  বেশ সুন্দর, তথ্যসমৃদ্ধ গ্রাফ এঁকেছে।  কি দেখাচ্ছে - নতুন কোরোনাভাইরাসকে ১০০% রেখেছে।  এবার x axis বরাবর দেখে যাচ্ছে অন্য ৪টি বাদুড়ের ভাইরাস আর ২০০২সার্স ভাইরাসের সঙ্গে এর জিনোমের কোথায় কতটা মিল।y axis এ % রেখেছে। সোজা জিনিস, একবার ভাল করে দেখ।  দেখ, ওপরের নীল লাইনটা (যেটা ৯০% র ওপরে চলছে সেটা হল নিকতম আত্মীয়  RaTG13. আর অন্য গোলাপি, খয়েরি, সবুজ হল অন্য বাদুড়ে ভাইরাস। আর লাল হল ২০০২-সার্স।  তাহলে একমাত্র   RaTG13 ছাড়া অন্যদের সঙ্গে কোথাও বেশি কোথাও কম মিল।  ৫৫% থেকে ৮০% র মধ্যে।
ছবি ২: নতুন করোনা র জিনোমের সঙ্গে অন্য ভাইরাল জিনোমের মিল অমিল। স্পাইক প্রোটিনের জিন সবার থেকে আলাদা।  Zhou, P. et al (2020)  Nature. 579, 270-273 থেকে নেওয়া। 

চন্দন: got it . কি সুন্দর গ্রাফটা !

নন্দন: দারুন, এগুলোই শিক্ষণীয়।  আমাদের ছাত্রদের শেখা উচিত, শুধু গাঁতালে আর কপি পেস্ট মারলেই চলে না। কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ কর, গ্রাফে একটা জায়গা আছে যেখানে সবার সঙ্গে নতুন কোরোনাভাইরাসের খুব বেশি অমিল।  এমনকি RaTG13র সঙ্গেও একটু অমিল দেখা যাচ্ছে।

চন্দন: দেখেছি।  ওই যে একটা sharp নেমে যাচ্ছে x axis এ ২০০০০ আর ২৫০০০র মধ্যে।

নন্দন: exactly. এবার গ্রাফের ওপরে জিনোমের জিনগুলো সাজানো আছে দেখ।  বক্স বক্স করে।  ওই জায়গাটায় কোন প্রোটিনের জিন দেখছিস?  S বা স্পাইক প্রোটিন।

চন্দন: স্পাইক প্রোটিন মানে তো যেগুলো ওই পায়ার মত ভাইরাস থেকে বেরিয়ে থাকে।  যে ছবিটা রোজ নিউজ চ্যানেলে দেখায়।

নন্দন:  তা তো বটেই। আর ওই স্পাইক হল সেই চাবি যা দিয়ে নতুন কোরোনাভাইরাস ঝট করে আমাদের কোষের আসে ACE ২ তালা খুলে ঢুকে পড়ে। স্পাইক তো সব কোরোনাভাইরাসের থাকে।  কিন্তু নতুন করোনার স্পাইক বাকিদের থেকে আলাদা। উপমা দিলে কেমন হবে বল তো - কোন একটা পরিবারে সবাই মোটামুটি ফর্সা, কিন্তু মাঝারি হাইট ৫.৭- ৫.১০। আর একজন আছে সেও ফর্সা, কিন্তু তার হাইট ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি।এটাই হল মজা।

চন্দন: কিন্তু। ..কিন্তু  .... ওর কাছেপিঠের আত্মীয় ভাইরাসে যদি ওইরকম স্পাইক প্রোটিনের জিন না থাকে তাহলে ওটা নতুন করোনা পেল কোথা থেকে?

নন্দন: এইটাই তো কথা। আর তো কোনো ভাইরাস দেখছি না।  তাহলে? এবং তখনই বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুললেন - নিশ্চয়ই প্রকৃতিতে এমন কোন ভাইরাস আছে যার সঙ্গে এই স্পাইক মিলে যায়।  কিন্তু সেই ভাইরাসের জিনোম আমাদের ডেটাবেসে নেই।

চন্দন: এরকম হতে পারে?

নন্দন: কেন হবে না ? খুব বেশি চান্স।  পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ প্রাণী আছে, কয়েক কোটি ধরণের ব্যাকটেরিয়া আছে, যত ব্যাকটেরিয়া সম্ভবত তার ১০গুন্ ভাইরাস আছে।প্রকৃতির সম্ভার সুবিশাল।  গত কুড়ি বছরে বিজ্ঞানীরা কয়েক হাজার জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন বটে, কিন্তু সে তো সিন্ধুতে বিন্দু।

চন্দন: দাঁড়া দাঁড়া।  এই তো দেখলাম বাদুড়ের RaTG১৩ র সঙ্গে ওই স্পাইক জিন ছাড়া খুব মিল।  আবার এখন বলছিস স্পাইক জিন আসবে আরেকটা অজানা ভাইরাস থেকে? একি একি ভাইরাস-ভাইরাস হাইব্রিড নাকি?

নন্দন: হা হা হা হা। অনেকটা ঠিকই ধরেছিস।  এবং এটাও ভাইরাসদের মধ্যে মাঝে মধ্যেই ঘটে। বিজ্ঞানীরা এঁকে বলেন antigenic shift .

চন্দন:  antigenic shift ? তাতে কি হয়?

নন্দন: ব্যাপারটা বেশ অভিনব। কি জানিস, ধর কোন একটা জন্তু আছে।  তার একই কোষে একই সময়ে দুটো আলাদা প্রজাতির ভাইরাস একসঙ্গে ঢুকে পড়েছে।ভাইরাস A আর ভাইরাস B.  just ঘটনাচক্রে এটা হয়ে গেছে। এবার তুই জানিস যে যে কোন কোষে একটা ভাইরাস ঢুকলে সে ওই কোষটাকে হাইজ্যাক করে ফেলে আর হুকুম দে শুধু নতুন ভাইরাস বানাতে।  ভাইরাল জিনোম, ভাইরাল প্রোটিন সব তৈরী হয়।  এবার এক্ষেত্রে কি ? দুটো ভাইরাস ঢুকেছে।  দুজনের প্রোটিন জিনোম তৈরী হচ্ছে একই কোষের মধ্যে।  এমনিতে হিসেবে মত সব ভাইরাস ঠিকঠাক প্যাক হবার কথা, Aর সঙ্গে B মিশে যাবে না।  কিন্তু, ওই মাঝে মাঝে একটু আধটু ভুল হয়ে যায়। A ভাইরাসের জিনোম একটা ছোট্ট অংশ টুক করে B ভাইরাসের জিনোমের সঙ্গে জুড়ে গেল।  একটা হাইব্রিড হয়ে গেল। ধর, এই হাইব্রিডের ৮৮% হল B ভাইরাস কিন্তু একটা ছোট্ট ১২% হল A ভাইরাস (ছবি ৩)।
ছবিটি ৩: Antigenic shift . দুটো আলাদা ভাইরাসের জিনোমের মধ্যে দেওয়া-নেওয়া দিয়ে এক নতুন ভাইরাসের সৃষ্টি। https://microbenotes.com/differences-between-antigenic-shift-and-antigenic-drift/ থেকে নেওয়া।  


চন্দন: যাহ সালা! কি করে হল?

নন্দন: বেশি বলব না।একে বলে homologous recombination. যারা মলিকিউলার বায়োলজি পড়ে তারা জানে। কেমন জানিস?  ধর, জেরক্সের দোকানে পাশাপাশি দু সেট কপি হচ্ছে।দুটোই ১০ পাতার, ৫০টা করে কপি হবে । টোটাল ১০০.   হয়ে গেলে দুটো সেট আলাদা আলাদা করে স্টেপল করে দেবে। এবার দোকানদার এটা করতে গিয়ে  ৪৮টা ঠিক করলেন, কিন্তু ২টো কপিতে এক সেটের ৩ নম্বর পাতা অন্য সেটে ভুল করে ঢুকিয়ে দিয়ে স্টেপল করে দিয়েছেন।

 চন্দন: এটা ভাল দিয়েছিস।

নন্দন: এটা অবশ্য আমি এক জায়গায় সেদিন পড়েছি। উপমাটা খুব ভাল লেগেছিল তাই মনে পড়ে গেল। তাহলে মোদ্দা কথা এমন হতে পারে।  আর রেজাল্ট হল একটা নতুন হাইব্রিড ভাইরাস তৈরী হয়ে যেতে পারে চট  করে।

চন্দন: আচ্ছা, এটা মানুষ বা অন্য প্রাণীতে হয়?

নন্দন: না ভাই। এক ডিম্বাণুতে দুজনের শুক্রাণু ঢুকে গিয়ে হাইব্রিড করে দিলে চাপ হয়ে যাবে।  ভাগ্যিস হয় না। এটা ভাইরাসদের ব্যাপার। ফিরে আসি আমাদের টপিকে - তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে স্পাইক জিন কোন ভাইরাস থেকে এল? এইখানে বলে রাখি একটা জিনিস বিজ্ঞানীরা  আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলেন - যে নতুন কোরোনাভাইরাস আদতে বাদুড় থেকে আসতে পারে কিন্তু সম্ভবত আরেকটা কোন প্রাণী জড়িত।  এরকম ভাবার কারণ ছিল।  ২০০২র সার্স ভাইরাস প্রথমে বাদুড় থেকে civet নামের ভামবেড়াল , আর তারপর civet থেকে মানুষে এসেছিল।  আর ২০১২র MERS ভাইরাস প্রথমে বাদুড় থেকে উট , আর তারপর উট থেকে মানুষে লাফ মেরেছিল।  তাছাড়া উহানের যে প্রাণী বাজার ডিসেম্বর মাসে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে সেখানে অনেক জন্তু জানোয়ার বিক্রি হলেও বাদুড় সেভাবে হয় না।  তাই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন আরেকটা কোনো প্রাণী আছে।

চন্দন: এই প্রাণীটা হচ্ছে প্যাঙ্গোলিন ? তাই তো ? কাগজে পড়েছি।
ছবি ৪: মালায়ান প্যাঙ্গোলিন। https://en.wikipedia.org/wiki/Sunda_pangolin#/media/File:Pangolin_borneo.jpg
নন্দন: হ্যাঁ, মালায়ান প্যাঙ্গোলিন, বৈজ্ঞানিক নাম Manis javanica (ছবি ৪) ।  প্রথম দিকে কিছু metagenomic search (ডিটেল তোর জানার দরকার নেই) করে বিজ্ঞানীদের মনে হয় প্যাঙ্গোলিনের মধ্যে যে ভাইরাস পাওয়া যায় তার সঙ্গে নতুন করোনার মিল অনস্বীকার্য।

চন্দন: আচ্ছা, একটা কথা বল।  এই ভাইরাসের জন্যে প্যাঙ্গোলিনের অসুখ করে না?

নন্দন: করে তো। সেটাই তো পরের ঘটনা।  গত বছর চীনের বন দপ্তর কিছু চোরাশিকারীকে  ধরেছিল যাদের থেকে ২৫টা মালায়ান পঙ্গোলিন পাওয়া গেসল।টেস্ট করে ১৭টার মধ্যে ভাইরাস পাওয়া গিয়েছিল। আর  কয়েক দিনের মধ্যেই,এই ১৭টা প্যাঙ্গোলিন একই রকম ফুসফুস-জনিত অসুখের সিমটম দেখায়।  দেড় মাসের মধ্যে ১৪টা প্যাঙ্গোলিন মরেও যায়।    সেই আক্রান্ত প্যাঙ্গোলিনদের ফুসফুস থেকে যে ভাইরাস পাওয়া যায় তার জিনোমকে নতুন করোনাভাইরাসের সঙ্গে মেলাতে গিয়েই জ্যাকপট! স্পাইক প্রোটিনের সঙ্গে ৯০% র বেশি মিল! এই গ্রাফটা দেখ (ছবি ৫)।  আগের মতোই, তবে এবার প্যাঙ্গোলিন ভাইরাসকে ১০০% (similarity 1) রেখেছে।  এবার x axis বরাবর দেখে যাচ্ছে অন্য ৪টি বাদুড়ের ভাইরাস, নতুন ভাইরাস আর ২০০২সার্স ভাইরাসের সঙ্গে এর স্পাইক প্রোটিনের জিনের কতটা মিল (similarity) । লাল লাইন হল নতুন কোরোনাভাইরাস।  অন্য লাইনগুলো অন্য ভাইরাস। লক্ষ্য কর, ১৪০০-১৫০০ nucleotide positionএ একটা জায়গা আসে যেখানে শুধু লাল লাইনটা মোটামুটি সিধে থাকে, বাকিগুলো ঝপ করে নেমে যায়।
ছবি ৫: নতুন কোরোনাভাইরাসের স্পাইক জীন কেবল প্যাঙ্গোলিন স্পাইক জিনের সঙ্গেই মেলে।  Xiao, K. et al (2020) Nature - online ahead of print থেকে নেওয়া 

চন্দন: দেখেছি।  কিন্তু এর মানে কি?

নন্দন: মানে হল একমাত্র নতুন কোরোনাভাইরাস (লাল লাইন) আর প্যাঙ্গোলিন ভাইরাস র স্পাইক জীন ওই জায়গায় মিলে যাচ্ছে।  বাকি অন্যদের ক্ষেত্রে ওই অঞ্চলটা আলাদা।

চন্দন: তো?

নন্দন: এটাই তো গোয়েন্দাগিরি রে।  সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন আসে স্পাইক প্রোটিনের ওই জায়গাটার কাজ কি?

চন্দন: স্পাইক প্রোটিনের কাজ তো জানি।  মানুষের কোষে ACE২ প্রোটিনে আটকে যাওয়া।

নন্দন: সে তো বটেই।আগেই বলেছি,  স্পাইক হল চাবি আর ACE ২ হল তালা। কিন্তু এবার প্রশ্ন হচ্ছে, ওই ১৪০০-১৫০০nucleotide position  'চাবি' র কোন অংশ  নির্ধারণ করছে।  সামনে না পেছনে? যে জায়গাটা ভাইরাসে আটকে থাকে? না যেটা ACE২র সঙ্গে খাপে খাপ লেগে যায় ?

চন্দন: ওরে ব্যাটা! ...চুলচেরা বিশ্লেষণ।

নন্দন: একদম।  এটা তো বুঝতেই হবে। আর analysis করে ফল কি বেরোল? দেখা গেল , যে ওই স্পাইকের ওই অঞ্চলটা শুধু যে ACE২ র সঙ্গে bind করে তা নয়, ঠিক ওখানে যে কয়েক অ্যামিনো অ্যাসিড আছে তারা এই খাপে খাপ চাবি-তালা আটকে যাওয়া আর নতুন কোরোনাভাইরাসের আমাদের কোষে ঢুকে পড়ার ব্যাপারে অপরিহার্য।স্পাইকের এই অঞ্চলতার নাম হল Receptor Binding Domain (RBD).  মানে চাবি তো ভালো হতে পারে, একেবারেই চট করে খুলে যায়, আবার অত ভাল নাও হতে পারে, কয়েকবার প্রেসার দিলে তবে তালা খোলে।  কোন চাবি কেমন সেটা চাবির নাকের ডগার খাঁজ ব্যাঁকা শেপ সাইজের ওপর নির্ভর করে।  এখানেও তাই।

চন্দন: বুঝেছি ভাই।  তুই বলতে চাইছিস  অন্য ভাইরাসের  স্পাইক এমন যে ACE২ তালার খাপে খাপ লাগতে একটু মেহনত করতে হয়। কারণ ওদের RBDর অ্যামিনো অ্যাসিড'র তফাৎ আছে। কিন্তু, নতুন কোরোনাভাইরাস আর প্যাঙ্গোলিন ভাইরাসর স্পাইক এত RBDর অ্যামিনো অ্যাসিড এমন ভাবে fine-tuned যে এক সেকেন্ডে তালা খুলে যায়।

নন্দন: হ্যাঁ।  এবং সেই জন্যেই জিনিসটা এতো ছোঁয়াচে।  ২০০২র সার্স ভাইরাস মারাত্মক ছিল, কিন্তু কম ছোঁয়াচে। নতুন কোরোনাভাইরাস অতটা মারাত্মক নয় (৯৫% লোক সেরে যাবে), কিন্তু এই প্যাঙ্গোলিন-মার্ক RBDটা এমন পেয়েছে যে অনায়েসে কোষে ঢুকে পড়ছে।  তাই প্রচন্ড ছোঁয়াচে।

চন্দন: কি বজ্জাত রে!

নন্দন: ভালো, খারাপ, বজ্জাত ভদ্র ব্যাপারই নয় এটা।  ওইসব কথাগুলো মানুষের ব্যবহারের ক্ষেত্রে খাটে। বিবর্তন একটা বায়োকেমিক্যাল খেলা , যার কোনো বিচার বুদ্ধি নেই।  চলছে চলবে।  যাক সে কথা।  তাহলে এখন অবধি রিসার্চ করে কি জানা গেল? এমন একটা নতুন বিটা  করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে যার জন্যে অনেকের বাজে রকমের নিউমোনিয়া হয়।  দুই, এর জিনোমের  সঙ্গে ২০০২র সার্স ভাইরাসের মিল ৭৯% কিন্তু বাদুড়ের একটি  কোরোনাভাইরাসের ৯৬% মিল। তিন, একটাই অঞ্চলে বাদুড় ভাইরাস আর নতুন ভাইরাসের মিল কম - স্পাইক প্রোটিনের জিনে।  চার, স্পাইক প্রোটিনের জিনের ভাল মিল পাওয়া গেল একটি প্যাঙ্গোলিন ভাইরাসের স্পাইক জিনের সঙ্গে।

চন্দন: বাবা! তাই বলছেন যে এটা মূলত বাদুড়ে ভাইরাসের মত, কিন্তু ওই একটা অঞ্চল প্যাঙ্গোলিন ভাইরাসের মত। আচ্ছা, বাদুড়ের ভাইরাস থেকে অসুখ হয়?

নন্দন: না, এবং সেটাই কথা।  শুধু বাদুড় ভাইরাস চলে এলে আমাদের মহামারী হত না। সম্ভবত antigenic shift হয়ে প্যাঙ্গোলিন ভাইরাস থেকে ওই স্পাইকজীনের RBD অঞ্চলটা এসেছে বলেই এ এমন ছোয়াঁচে হয়ে উঠেছে।দুটোর RBDর মাত্র একটা অ্যামিনো অ্যাসিড তফাৎ। আর সব এক। প্রকৃতির চিরন্তন ভাঙা-গড়ার খেলা।

চন্দন: আচ্ছা, ভাইরাসটা বাদুড় থেকে প্যাঙ্গোলিনে গেল কি করে? বাদুড় তো প্যাঙ্গোলিন খায় না, প্যাঙ্গোলিন ও  বাদুড় খায় না।

নন্দন: হা হা।  তা খায় না ঠিকই।  তবে দুটো প্রাণীই মোটামুটি একই পরিবেশে থাকে।  দুটোরই বাস চীন ও পূর্ব এশিয়ায়।  দুটোই নিশাচর, পোকা মাকড় খায়, ফল খায়।  একই বনাঞ্চলের প্রাণী। কার ফেলে যাওয়া খাবার কে খেয়েছে, বা কার মল থেকে ভাইরাস কার খাবারে মিশে গেছে। ....খুবই সম্ভব।  এ ভাবেই ভাইরাসরা ঘুরে বেড়ায়।

চন্দন: বাহ্! এটা একটা ভাল ecological ব্যাখ্যা।

নন্দন: হ্যাঁ।  এত বিজ্ঞানীরা লিখেছেন পেপারে।.....কিন্তু আরেকটা ব্যাপার আছে। ....চাবিটার আরেকটা খেল আছে।  সেটাও ফাটাফাটি।

চন্দন:  কি চাবি ভাই এই স্পাইক প্রোটিন।আলী বাবার চিচিং ফাঁক তো এর কাছে কিছুই নয় !

নন্দন: এই ছবিটা দেখ।  আরেকটা রিসার্চ পেপার থেকে নেওয়া।    লক্ষ করে দেখ, স্পাইক প্রোটিনকে বিজ্ঞানীরা দুভাগে ভাগ করেছেন - S1 আর S2. S1এ আছে RBD . দেখেছিস? (ছবি ৬)
ছবি ৬: নতুন কোরোনাভাইরাসের স্পাইক জিনে polybasic cleavage site. অন্য ভাইরাসদের নেই।  Anderson KG et al (2020) Nature Medicine. 26, 450-452 থেকে নেওয়া। 
চন্দন: ঠিক আছে।

নন্দন: S2 দেখ।  কয়েকটা তিনটে দাঁড়ি কাটা আছে। আর স্পাইক প্রোটিনের ওই অঞ্চলটা এনলার্জ করে দেখিয়েছে, একদম তলায় যে row করে অক্ষরগুলো সেগুলো হচ্ছে অ্যামিনো অ্যাসিড'র সারি।  amino acid sequence. দেখ, নতুন করোনা আছে, বাদুড়ের RaTG13 আছে, প্যাঙ্গোলিন ভাইরাস আছে, ২০০২র সার্স ভাইরাস আছে।

চন্দন: দেখেছি।

নন্দন: এবার লক্ষ কর, একটা জায়গা দেখবি যেখানে একমাত্র নতুন করোনা ভাইরাসের সারিতেই পাঁচটা অক্ষর PRRAR, অর্থাৎ পাঁচটা অ্যামিনো অ্যাসিড আছে।  তলার অন্যগুলো, এমনকি প্যাঙ্গোলিন ভাইরাসও খালি, P আছে, আর শেষে R আছে, কিন্তু মাঝখানে খালি।  ব্ল্যাংক, তাই - সিম্বল দিয়ে রেখেছে। এর মানে হল ওই পরপর পাঁচটা অ্যামিনো অ্যাসিড একমাত্র আমাদের নতুন কোরোনাভাইরাসের আছে। আর ওপরে লেখা আছে polybasic cleavage site.

চন্দন: এই polybasic cleavage siteর কাজ কি?

নন্দন: এ হচ্ছে নতুন কোরোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের গোপন অস্ত্র। কি জানিস, অনেক প্রোটিন থাকে যারা তৈরী হয়, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই active হতে পারে না।  যেমন ধর আমরা সবাই স্কুলের বইতে পড়েছি পেটে আর স্মল ইন্টেস্টাইনে  (ক্ষুদ্রান্ত্রে) পেপসিনোজেন আর ট্রিপসিনোজেন নামের উৎসেচক প্রথমে inactive অবস্থায় নিঃসৃত হয়।  তারপর তাদের একটা ছোট্ট অংশ ছেঁটে ফেলে দিলে সেগুলো active উৎসেচক পেপসিন আর ট্রিপসিন হয়ে ওঠে।  পড়েছিলি মনে আছে?

চন্দন: মনে পড়ছে।  পেটের হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড পেপসিনোজেনকে পেপসিন করে দেয়।

নন্দন: একশোয় একশো।  ঠিক একই কথা স্পাইক প্রোটিনের ক্ষেত্রে লাগে।এমনিতে ও ACE২ গায়ে আটকাতে পারবে না, তালাও খুলবে না।  কিন্তু আমাদের শরীরের অনেক কোষকলায় Furin  নামের একটি বিশেষ উৎসেচক (enzyme)  পাওয়া যায়, আর Furin ওই PRRAR ঠিক চেনে।  ফুরিন এসে ওই জায়গাটা কুচ করে কেটে দেয় , আর তখনই একটিভ হয়ে ওঠে করোনার স্পাইক।

চন্দন: যেন, একটা স্প্রিংকে চেপে রেখে ছেড়ে দেওয়া হল।

নন্দন: একদম।  একজন বিজ্ঞানী বর্ণনা করেছেন এ হল আমাদের বোতাম-টেপা ফোল্ডিং ছাতার মত. বন্ধ ছিল, কিন্তু বোতাম টিপতেই খুলে গেল।  ছাতা রেডি। ফুরিন অনেক কোষে পাওয়া যায়।  যেমন ফুসফুসে। বুঝতেই পারছিস, কিরকম advantage . কোন মতে নাক দিয়ে মুখ দিয়ে ঢুকতে পারলেই হল।  ACE ২ ও আছে, ফুরিন ও আছে।  চাবি তালা, চিচিং ফাঁক।

চন্দন: অন্য ভাইরাসগুলো তাহলে ঢুকবে কি করে? ওদের তো  polybasic cleavage site নেই।

নন্দন: সেটাই তো।  নেই বলেই তো ওরা হয় কোন রোগ করতে পারে না, কিংবা এতটা ছোয়াঁচে নয়।  একটা মাত্র R আছে, সেটাকে কিছু উৎসেচক চেনে। কিন্তু ওই পজিশনে polybasic cleavage siteর মত এতো চট করে কাটা যায় না।  একটু সময় লাগে।  তাই অন্য ভাইরাস এতো ছোয়াঁচে নয়।  নতুন কোরোনাভাইরাস যে  একটি দারুন RBD ও একটি polybasic cleavage site একসঙ্গে বাগিয়েছে সেটাই ওকে প্রতিযোগিতায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। বায়োলজিতে যাকে বলে gain of function.  ভেবে দেখ, ও কিন্তু আমাদেরই দুটো গুরুত্ব পূর্ণ প্রোটিন - ACE২ আর ফুরিন - ব্যবহার করছে আমাদেরই বিরুদ্ধে।

চন্দন: বাবা! ক্ষুদ্র বলিয়া অবজ্ঞা করিও না।  আচ্ছা, অন্য কোন ভাইরাসে এরকম polybasic cleavage site পাওয়া যায়?

নন্দন: যায় বইকি। কিছু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে পাওয়া যায়, এবং সেগুলোই বেশি ছোঁয়াচে। ব্যাপারটা নতুন নয়, বলতে পারিস old wine in new bottle. কিন্তু সেই জন্যেই বিজ্ঞানীরা দেখেই চিনতে পেরেছেন।  নতুন কোরোনাভাইরাস প্রকৃতিতে নতুন, কিন্তু ও যে রাস্তা ধরে বিবর্তিত হচ্ছে সেটা নতুন নয়।

চন্দন: কিন্তু, RBD না হয় এসেছে প্যাঙ্গোলিন ভাইরাস থেকে। এই polybasic cleavage site কোন ভাইরাস থেকে এলো?

নন্দন: এইটা খুব ভালো প্রশ্ন, এবং তুই যদি এক সপ্তাহ আগে করতিস উত্তর দিতে পারতাম না।  এখন পারব।  দেখ, এটা ঠিক যে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যেই পৃথিবীর অনেক ল্যাবের বিজ্ঞানীরা বুঝে গেছেন RBDটা কি ভাবে কাজ করে, কথা থেকে এলো ইত্যাদি।  কিন্তু ওই polybasic cleavage site কোথা থেকে এল এটা বোঝা যাচ্ছিল না।  খুব সম্ভবত কোন এক অজানা ভাইরাস থেকে, কিন্তু কে সে? কোথায় সে? এই চলছিল খোঁজ।

চন্দন: তা রিসেন্ট কি পাওয়া গেল ?

নন্দন: চীনের ইউনান প্রদেশের প্রায় ২২৭টা বাদুড় থেকে ভাইরাস বের করে তাদের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে।  স্টাডি করা হয়েছে। এবং একটি ভাইরাস পাওয়া গেছে যার নাম দেওয়া হয়েছে RmYN02. এ বেশ মজার ভাইরাস। আমাদের নতুন করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মিল আছে, আবার নেই ও।  এক এক যায় মিল, এক এক যায় অমিল।  এর RBD বেশ আলাদা। কিন্তু লক্ষণীয় হল এর S1-S2 জংশনে ঐরকম তিনটে অ্যামিনো অ্যাসিড বসানো আছে।

চন্দন: polybasic cleavage site?

নন্দন: ঠিক তা না।  এখানে আছে PAA. তবে খুব যে দূরে নয় বুঝতেই পারছিস। একটা প্রদেশে মাত্র ২২৭টা  বাদুড় খুঁজলে যদি এই PAA পাওয়া যায়, মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে বলা যায় যে আরো কয়েকশো বা এক দু  হাজার বাদুড় বা প্যাঙ্গোলিন খুঁজলেই ওই PRRAR পাওয়া যাবে। দেখবি, মাস খানেক বা তার আগেই বেরিয়ে যাবে। আরে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা প্রচন্ড fast খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

চন্দন : কিন্তু এসব হল কি করে ? কখন?

নন্দন: ' কি করে' উত্তর হল এটাই তো বিবর্তন। ছোট ছোট variation আর সেই ভিত্তি করে selection. নতুন কোরোনাভাইরাস আদতে একটা বাদুড়ে ভাইরাস। কিন্তু ঘটনাচক্রে mutation আর  recombination antigenic shift করে কিছু unique সিকোয়েন্স পেয়ে গেছে, আর মানুষের কাছে এসে পড়াতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেছে। ওর যা আছে অন্যদের নেই। survival of the fittest.
আর 'কখন'? যা যা বললাম সেটা অনেকটা আমাদের এগিয়ে দিলেও এটা এখনো ১০০% নিশ্চিত নয়।  দেখ, দুটো জিনিস হতে পারে।  হয়,  বাদুড় থেকে প্যাঙ্গোলিন হয়ে আসার পথে এইসব mutation নতুন ভাইরাসে ঢুকেছে। অথবা, দুই, মানুষে ইনফেকশন শুরু গোড়ার দিকে এই সব mutation পেয়ে গেছে। এখন এক আর দুই কোন পথে এসেছে সেইটা আরো অনেক জিনোম ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন। অবশ্য, যে পথেই আসুক মোদ্দা কথা হল  - mutation হয়েছে, আর  mutation থেকে এসেছে variation, কোন কোন ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন নতুন ক্ষমতা অর্জন করেছে আর সেই ভিত্তি করে natural selection তাকে বংশবৃদ্ধির পথে এগিয়ে দিয়েছে।

চন্দন: সব বুঝলাম, অকাট্য যুক্তি।  কিন্তু একটা কথা বল।  আজকের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং যুগে এসব কি সত্যি কোন বিজ্ঞানীর করা অসম্ভব? তুই তো বলছিস।  একদম আনকোরা নতুন কিছু নয়।  তাহলে কেউ গোপনে কেন করতে পারবে না?

নন্দন: হ্যাঁ। এতক্ষন ধরে যা বললাম সেটা হল গত চারমাসে বিজ্ঞানীরা কি আবিষ্কার করেছেন আর কি conclude করেছেন।  মনে রাখতে হবে এমনি এমনি ভুল ভাল বললে ভয়ানক বদনাম হবে।  পলিটিক্স করলে যা ইচ্ছে বলে পার পাওয়া যায়, বিজ্ঞানে যায় না।  একবার black listএ নাম উঠে গেলে কেউ বিশ্বাস করবে না।  আর তাছাড়া বিজ্ঞানীরা জানেন প্রকৃতির বিশাল সম্ভারের কথা।  সুতরাং সেখানেই প্রথম খুঁজেছেন আর বিজ্ঞানের জানা পথে উত্তর ও পেয়েছেন। তাই দেখবি, ট্রাম্প আর অন্য পলিটিশিয়ানরা যাই বলুক বিজ্ঞানীরা এসব নিয়ে বেশি কিছু বলছেন না।  খালি আমেরিকার ডঃ ফকি বলেছেন এটা ন্যাচারাল ভাইরাস। বেশি বলে লাভ কি? রাজনীতির লোকেরা নিজেদের ধান্দায় চলে। তাই বিজ্ঞান যাই বলুক মানবে না। বয়ে গেল।  তবে হ্যাঁ, বৈজ্ঞানিক দিক থেকে এবার তোর এই প্রশ্নটার উত্তর দেবার সময় এসেছে।

চন্দন: মানে, আমি বলতে চাইছি যে হতেই পারে ন্যাচারাল ভাইরাস। কিন্তু এটাও তো হতে পারে যে কোন গোপন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবে বাদুড় ভাইরাস, পঙ্গোলিন ভাইরাস থেকে cut n paste করে বানিয়ে ফেলেছে?

নন্দন: জানি তুই এটাই বলবি। দেখ, আমি পর পর কয়েকটা পয়েন্ট বলছি।  এবার তুই ভেবে না কোনটা যুক্তি দিয়ে কাটতে পারবি।
১।  এতে কোন সন্দেহ নেই যে নতুন কোরোনাভাইরাস জিনোমের সিংহভাগ হচ্ছে বাদুড়ে ভাইরাস RaTG13র মত।  ঠিক তো? কিন্তু RaTG13 তো কোন মানুষে কোন অসুখ করে না। তার মানে যদি কেউ গোপনে একটা খুব সংক্রামক মারাত্তক ভাইরাস বানাতে চায়, তাহলে সে নিরীহ, অজানা RaTG13 জিনোম ভিত্তি করে বানাতে যাবে কেন? আরো কত ভাইরাল জিনোম তো আছে, ভাইরাস সম্পর্কে আজকে আমাদের যা জ্ঞানভান্ডার তা তো বিশাল। বেশি দূরে যেতে হবে না, নতুন কোরোনাভাইরাসের আত্মীয় ২০০২র সার্স ভাইরাস বা ২০১২র MERS ভাইরাস নিয়ে করলেও তো হত।  তাই না? তরোয়াল যদি বানাতেই হবে সেটা স্টিল দিয়ে বানাবো, কার্ডবোর্ড দিয়ে বানাতে যাব কেন?

চন্দন : তা বটে। ....

নন্দন: শুধু তাই নয়। ২. এরকম একটা অজানা নিরীহ ভাইরাসকে আদৌ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার করে সংক্রামক করা যাবে কি না তারই বা কি গ্যারান্টি? তুই ভাবছিস হয়ে যাবে। ভাবলেই তো হল না।  এটা চেষ্টা করতে বহু মাস থেকে বছর লেগে যেতে পারে। এই ধরনের এক্সপেরিমেন্টকে বলে Reverse genetics এবং সেটা বেশ শক্ত - একটা একটা করে প্রোটিনের জিন বানাতে হবে, তাদের পরীক্ষা করতে হবে এবং তারপর সব জুড়ে আবার দেখতে হবে কাজ হচ্ছে কিনা।  অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ এবং সাফল্য নাও আসতে পারে -  কারণ ওর মূল কাঠামোই দুর্বল। আরে বাবা, যতই চেষ্টা কর একটা ভেড়া কক্ষনো বাঘ হয়ে উঠতে পারবে না।  এবার ভাব - তুই এরকম এক সিক্রেট প্রজেক্টে কাজ করছিস।  অনেক বছর অনেক ডলার খরচ করে শেষে হাতে এল লবডঙ্কা, কারণ গোড়াতেই গলদ ছিল।  এটা কোন ঘোড়েল অস্ত্র ম্যানুফ্যাকচারার করবে তোর মনে হয়? উত্তর একটাই - না।

চন্দন: না, করবে না। করতে হলে ভাল করেই করবে।

নন্দন:  ঠিক।  তবে শুধু RaTG13 কাঠামো নয়। স্পাইক প্রোটিনের RBDও বলে দিচ্ছে এটা একটা ন্যাচারাল প্রোটিন।  মানুষের তৈরী নয়।

চন্দন: কিরকম?

নন্দন: ৩. দ্যাখ, নিশ্চই মনে আছে স্পাইকের RBD হচ্ছে চাবির একদম সামনের অংশটা, যা দিয়ে অনায়াসে ACE২ তালা খোলা যায়। কারণ,  ওখানে ৬টা অ্যামিনো অ্যাসিড আছে যারা এই কাজটা দারুন করতে পারে।

চন্দন: মনে আছে।

নন্দন: এগোবার আগে একটা কথা বলে রাখি। ২০০২ সালে চীনে সার্স মহামারীর পর থেকে এই সব ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব ব্যাপি গবেষণা শুরু হয়।  তারপর প্রায় ১৮ বছর কেটে গেছে, অনেক অনেক গবেষণা হয়েছে।  বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছেন কি করে স্পাইক প্রোটিন ACE২ র সঙ্গে লেগে যায়।  যেহেতু দুটোই প্রোটিন, আর প্রোটিন মানেই পরপর সাজানো অ্যামিনো অ্যাসিড, তাই এটা ফাইনালি হল অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে অ্যামিনো অ্যাসিড চেনার মলিকিউলার  খেলা। বিজ্ঞানীরা ন্যাচারাল ভাইরাস প্রোটিন স্টাডি করেছেন, কম্পিউটারে মডেল করেছেন , পরীক্ষা করেছেন যা রিএকশন দেখছেন সেটাই কি ১০০% বেস্ট না কি ইঞ্জিনিয়ারিং করে প্রকৃতির থেকেও বেটার করা যায়।

চন্দন: প্রকৃতির থেকেও better হয় নাকি?

নন্দন: হতেই পারে। বিবর্তন তো ঠিক ইঞ্জিনিয়ার নয়, যে আগে থেকে ভেবেচিন্তে design করে,  বেস্ট মালপত্র দিয়ে বেস্ট জিনিসটাই সবসময় তৈরী করবে । প্রকৃতিতে অনেক কিছুই চলে তাপ্পি দিয়ে।আগে থেকে আছে, একটু variation হল সেটাই selected হল। একে বলে tinkering, জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে দাও, নতুন করে বানাবার দরকার নেই। মানুষ যেটা স্বজ্ঞানে করে সেটা হল ইঞ্জিনিয়ারিং, আর বিবর্তন হল জোড়াতালি, তাপ্পি দেওয়া tinkerer.

চন্দন : সেটা এক্ষেত্রে কেন ইম্পরট্যান্ট?

নন্দন: এক্ষেত্রে এটা বলা দরকার কারণ বিজ্ঞানীরা এত বছর যখন স্পাইক প্রোটিন নিয়ে গবেষণা করছিলেন তখন বেশ কয়েক বছর আগে এমন একটা স্পাইক ল্যাবরেটরিতে বানিয়ে ফেলেছিলেন যেটা একদম বেস্ট। ওটাই ACE২র  সঙ্গে সবচেয়ে ভাল আটকে যায়। ঠিক যে যে  অ্যামিনো অ্যাসিড দিলে RBD সবচেয়ে ভাল খাপেখাপ লেগে যাবে সেগুলো দিয়েছিলেন, আর ফল ও তেমন পেলেন। যাকে বলে একদম optimized.

চন্দন: তারপর  ?

নন্দন: তাহলে এটা নিশ্চয়ই আশা করা যায় যে যদি কেউ ল্যাবে ওই নতুন কোরোনাভাইরাস বানায় সে ওই ল্যাবে তৈরী বেস্ট স্পাইক নেবে।  তাই তো? স্বাভাবিক। সে তো একটা মারাত্মক বায়োলজিকাল অস্ত্র বানাতে চাইছে , অন্তত তাই তো ডোনাল্ড-ভাই দাবি করছেন।  কিন্তু, বিজ্ঞানীরা দেখলেন নতুন কোরোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের RBD  বেশ ভাল কাজ করে, কিন্তু ওর অ্যামিনো অ্যাসিড গুলো পরিষ্কার আলাদা আর optimized নয়।(ছবি ৭)

চন্দন: তার মানে ওটা ন্যাচারাল, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে তৈরী নয়।?

নন্দন: exactly . যদি ল্যাবে তৈরী হত তাহলে ওই unnatural optimized RBDর মত হত। সত্যি বলতে কি, এমন যে একটা RBD কাজ করতে পারে, আমাদের কম্পিউটার মডেলিং সেটা বের করতেই পারেনি।  কিন্তু বিবর্তনের ক্ষমতা অসীম, মানুষের টেকনোলজি যা পারে না সেটা করে ফেলে। এবারেও পেরেছে।দেখে বিজ্ঞানীরা অবাক - এভাবেও হয় ! এবং এই নতুন ভাইরাস যে ল্যাবে তৈরী নয়, প্রকৃতির ফসল,  এটার পক্ষে খুব বড় প্রমান।

ছবি ৭: কম্পিউটার মডেলিং করে ল্যাবে তৈরী optimized RBD (বাঁদিকে ) আর নতুন কোরোনাভাইরাসের RBD (ডানদিকে) . ACE২ সঙ্গে bind করতে আলাদা আলাদা অ্যামিনো অ্যাসিড  ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষের টেকনোলজি আর প্রকৃতি দুটি আলাদা পন্থা নিয়েছে।  Wan, Y. et al (2020)  Journal of Virology. 94, e00127-20 থেকে নেওয়া।  
চন্দন: বাপস ! আশ্চর্য!

নন্দন: সত্যিই আশ্চর্য।  এবং এটাই শেষ নয়।  চার নম্বর বলে শেষ করি - স্পাইক প্রোটিন টা তো বুঝতেই পারছিস প্রোটিন।  কিন্তু ওর সঙ্গে কিছু কার্বোহাইড্রেট লেগে আছে। কিছু অ্যামিনো অ্যাসিড আছে যারা সেই কার্বোহাইড্রেটগুলোকে বেঁধে রেখেছে।  নিচের ছবিটা দেখ- এদের বলে O-linked glycan residues (ছবি ৮).

ছবি ৮: স্পাইক প্রোটিনে O-linked glycan residuesর অবস্থান।  সেই সব অ্যামিনো অ্যাসিড যারা কার্বোহাইড্রেটদের বেঁধে রাখে। Zhou, H. et al (2020) Current Biology. 30, 1-8 থেকে নেওয়া 
চন্দন: এদের আবার কি কাজ ?

নন্দন: আত্মরক্ষা।  ডিফেন্স।  যখন ভাইরাস আমাদের শরীরে ঢোকে তখন তো সম্ভাবনা আছে যে ওকে আমাদের রোগ প্রতিরোধকারী immune system  চিনে ফেলবে, তাই না।  এই কার্বোহাইড্রেট গুলো হচ্ছে নতুন করোনার camouflage. ওকে চিনতে দে না।  immune system ওকে দেখেও দেখতে পায় না , আর ওই ফাঁকে ও ঢুকে পড়ে। এটাও শুধু নতুন কোরোনাভাইরাসেরই আছে।

চন্দন: এটা আবার কোথা থেকে এল ?

নন্দন: সেটা এখনো ঠিক বেরোয়নি, তবে এটাও নতুন কিছু না।  অনেক ভাইরাসের থাকে।  যেটা আসল কথা সেটা হল এই জিনিস কোনোমতেই ল্যাবে করা যেত না।  এরকম  O-linked glycan residues বিবর্তিত হতে হলে সেই প্রোটিন (বা তার ভাইরাসকে) বেশ কিছুদিন কোন এক বা একাধিক স্তন্যপায়ীর মধ্যে থাকতে হবে।  তবে হবে, এমনি এমনি ল্যাবের টেস্টটিউবে হবে না।

চন্দন: কোন স্তন্যপায়ী?

নন্দন: সেটা এখনো কেউ জানে না।  ওই  O-linked glycan residues কবে নতুন করোনা পেল সেটা জানা যায়নি।  তবে বাদুড়, মানুষ, প্যাঙ্গোলিন সবই তো mammal. কারুর না কারুর মধ্যে অবস্থান কালে কোন একটা ভাইরাস এটা  পেয়েছিল।  আর যে পেয়েছে তার অ্যাডভান্টেজ, কারণ তাকে immune system মারতে পারে না, তাই তার বংশ বৃদ্ধি বেশি হয়, তাই সে এখন ছড়িয়ে পড়ছে। বলছি, না বিবর্তনের ক্ষমতা অসীম।  ৪০০ কোটি বছর ধরে এই ভাঙা গড়া খেলা চলছে ভাই।  মানুষ আর কতটুকু করেছে, মানুষও তো ওই খেলারই ফল।  করোনার মত।

চন্দন: আর কিছু ?

নন্দন: আরো কিছু প্রমান আছে।  তবে থাক। এই অনেক।  তাছাড়া উহানের ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি পৃথিবীর অন্যতম নামকরা গবেষণাগার।  সারা পৃথিবীর লোক ওখানে collaboration এ কাজ করতে যান।  ওটা বানাতে মার্কিন এবং ফ্রেঞ্চ গবেষকদের হাত আছে।  সেই জায়গায় কেউ কোনোদিন কোন সন্দেহ করেনি, এত বিদেশী কাজ করেছেন অথচ কেউ কোনোদিন কিছু সন্দেহজনক রিপোর্ট করেনি।  ওখানে লুকিয়ে জৈবিক অস্ত্র গবেষণা হবে এসব গাঁজা। তাছাড়া একটা অস্ত্র তখনই ভাল যখন সেটা কন্ট্রোল করা যায়।  দেখতেই তো পারছিস নতুন ভাইরাস কিরকম একটার পরে একটা দেশ ঘায়েল করে দিচ্ছে।  টোটাল-ক্যালানে না হলে এমন অস্ত্র কেউ বানিয়ে সেমসাইড খেতে যায়?!  ওসব আষাঢ়ে গপ্পো, হলিউডের সিনেমায় চলে।

চন্দন: তা বটে।  তাছাড়া একটা কথা আমি অনেক ভেবেছি। চাপাচাপি করতে হলে চীন করতেই পারতো।  ওদের এক-পার্টি শাসক দেশে সেটা করাও যায়।  কিন্তু, চীনের বিজ্ঞানীরা জানুয়ারি মাসেই এই জিনোম ডেটা সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের দিয়ে দিয়েছেন, তাই নিয়েই সবাই কাজ করছে।

নন্দন: মোক্ষম দিয়েছিস।  এটা কখনো হতে পারে নিজেরা ভাইরাস বানাবো, আবার সেই ভাইরাসের জিনোম - অর্থাৎ ব্লুপ্রিন্ট - সারা পৃথিবীতে বিলিয়ে দেব ???   পাগল না কি?  ....দেখ, শেষ কথা হল , একদিকে কোনো প্রমান নেই।  অন্যদিকে জীবন বিজ্ঞানের দেড়শো বছরের সম্মিলিত জ্ঞান। আমি যা জানি মোটামুটি অনেক তথ্য তোর সামনে রেখেছি। এবার  কোনটা বিশ্বাস করবি সেটা তোর ব্যাপার।

চন্দন: সে আর বলতে।  ....তবে মানুষের কি কোন হাত নেই?

নন্দন: আছে আছে, নিশ্চয়ই আছে।  সত্যি বলতে কি , কম বেশি আমরা সবাই দোষী। এই যে ভয়ানক পরিবেশ দূষণ চলছে, বন্যপ্রাণী অবাধে চোরা শিকার চলছে, বনের পরে বন কেটে সাফ হয়ে শহর হচ্ছে এই সবকিছুর ফলে আজকে আমাদের সঙ্গে অনেক বেশি জন্তু জানোয়ারদের দেখা হচ্ছে।  হবেই তো, দোষ তো ওদের নয়।  আমরাই তো ওদের বাড়ি ঘর ভেঙে দিয়েছি। কত প্রাণী গত কুড়ি বছরে নিশ্চিহ্ন হয়েছে বল তো ? পুরোনো গবেষণা পত্র, সেমিনারের বক্তৃতা খুলে দেখ,  বিজ্ঞানীরা ১০-১৫ বছর ধরে বলে আসছেন এভাবে চললে নতুন মহামারী অতিমারী আসবেই, কেউ কথা শুনিনি। বিপদ এসেছে। এখন অবস্থা টাইট। আবার তার মধ্যেও নিজেদের বদমাইশি চালু রেখেছি।

চন্দন: আর সমস্যা তো ঠিক অসুখের নয়।  .....

নন্দন: নয় তো। এর থেকে আমাদের যক্ষা, ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া অনেক ডেঞ্জারাস। এই অসুখে তো ৯৫% লোক সেরে যায়।  সমস্যা তো মূল অসুখ নিয়ে নয়,  সমস্যা হচ্ছে গত ২০-২৫ বছরে বহু দেশ সহজলভ্য পাবলিক হাসপাতাল কমিয়ে প্রাইভেট বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে বেড কমে গেছে - শুধু আমাদের দেশে নয়, জার্মানি ছাড়া প্রায় পুরো ইউরোপে এই প্রাইভেটগিরি করতে গিয়ে হয়েছে; আমেরিকার কথা তো বাদই দে, চিরকালই সাস্থের ব্যাপারে বাজে ।  এখন বোঝো ঠ্যালা।  বিপদের দিনে বেড নেই, ভেন্টিলেটর কম।

চন্দন: এসব তো মানুষের অপরাধ বটেই।

নন্দন: ঠিক মানুষ বলব না। আমাদের ভয়ানক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লোভ।  যা মানুষকে মানুষ জ্ঞান করে না। যা ভুলে যায় যে আমরা টেকনোলজি'র দিক থেকে অনেক উন্নতি করলেও এখনো প্রকৃতির মধ্যেই আছি।বলতে প্যারিস, করোনা'র মাধ্যমে এ যেন প্রকৃতি আমাদের একটা হালকা টোকা মেরে গেল - বলে দিল, ওহে মানুষ, তোমরা আমার মধ্যেই আছো, আমার মধ্যেই থাকবে।



REFERENCES

(তিন কিস্তির এই রচনা লিখতে বেশ কিছু গবেষণা পত্র থেকে মালমশলা নিতে হয়েছে। তলায় তাদের লিস্ট করে দিলাম। মনে রাখবেন নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য আসতেই পারে, বিশেষত প্যাঙ্গোলিন না হয়ে অন্য কোন প্রাণীও হতে পারে। )

1. Anderson KG et al (2020) The proximal origin of SARS-CoV-2. Nature Medicine. 26, 450-452.

2. Wan, Y. et al (2020) Receptor Recognition by the Novel Coronavirus from Wuhan: an Analysis Based on Decade-Long Structural Studies of SARS Coronavirus. Journal of Virology. 94, e00127-20

3. Zhou, P. et al (2020) A pneumonia outbreak associated with a new coronavirus of probable bat origin. Nature. 579, 270-273.

4. Zhang, T. et al (2020) Probable Pangolin Origin of SARS-CoV-2 Associated with the COVID-19 Outbreak. Current Biology. 30, 1-6.

5. Xiao, K. et al (2020) Isolation of SARS-CoV-2-related coronavirus from Malayan pangolins. Nature. online ahead of print in May 2020.

6. Zhou, H. et al (2020) A novel bat coronavirus closely related to SARS-CoV-2  contains natural insertions at the S1/S2 cleavage site of the spike protein. Current Biology. 30, 1-8.

7. Wrapp, D. (2020)  Cryo-EM structure of the 2019-nCoV spike in the prefusion conformation. Science. 367, 1260-1263.

8. Zhang, Y. and Holmes, E. (2020) A Genomic Perspective on the Origin and Emergence of SARS-CoV-2. Cell, 181, 1-5.

9. https://leelabvirus.host/covid19/origins-part1; https://leelabvirus.host/covid19/origins-part2; https://leelabvirus.host/covid19/origins-part3 নিউ ইয়র্কের ইক্যাং স্কুল অফ মেডিসিন, মাউন্ট সিনাইয়ের প্রফেসর বেনহুর লি ল্যাব এই বিষয়ে বেশ সহজের সঙ্গে লিখেছেন। পড়া উচিত।

10. https://microbenotes.com/differences-between-antigenic-shift-and-antigenic-drift/














 স্কুল খুলুক, সঙ্গে হাওয়া বাতাস খেলুক ক্লাসঘরে ('এই সময়' সংবাদপত্রে প্রবন্ধ -  ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১)      সোজাসাপ্টা অপ্রিয়   সত...