Monday, August 24, 2020



পশ্চিমবঙ্গের করোনা পরিস্থিতি : জুলাই - অগস্টে কি দাঁড়াল? 

ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের করোনা সমাচার নিয়ে কোন update সেই জুন মাসের পরে লিখিনি। দু-তিন দিন আগে একজন বন্ধু জিজ্ঞেসও করল সে বিষয়ে।  না লেখার তিনটে কারন - ১. একটু সময়ের অভাব। ২. করোনা বিজ্ঞান নিয়ে, বিশেষত ভ্যাকসিন নিয়ে, অনেক লিখেছি এই সময়ে । ৩. দুমদাম ব্রেকিং নিউজ করে যা-ইচ্ছে-তাই লিখতে যে পারি না সেটা পাঠকরা এতদিনে বুঝে গেছেন।  তাই, এই নতুন জীবাণুসৃষ্ট-অতিমারী কি ভাবে এগোচ্ছে, কি বৈজ্ঞানিক তথ্য হাতে আসছে সেগুলো না পড়ে না বুঝে তো আপনাদের কাছে present করা যায় না, তাই না?

তবে এই  যে কয়েক মিনিট বকবক করলাম তাতে বুঝতেই পারছেন সেই সাবজেক্ট নিয়ে এখন আবার লিখছি। ২৪শে মার্চের পরে ২১ দিন নয়,  প্রায় ৫ মাস কেটে গেছে -   দেশ ও রাজ্যের কি অবস্থা দেখা যাক।

১. প্রথমেই 'চাক দে'।  আজ যখন এটা লিখছি নজরে এল ভারতে টোটাল আক্রান্ত তিরিশ লক্ষ ছাড়িয়ে গেল। তলার  ছবিটা দেখুন। প্রথম দশ লক্ষ আক্রান্ত হতে লেগেছিল ১৬৮ দিন।  সাড়ে পাঁচ মাস।  ১০ থেকে ২০ লক্ষ হতে মাত্র ২১ দিন, আর ২০ থেকে ৩০ লক্ষ হতে ১৬ দিন। কি বুঝছেন?
ছবি ১: ভারতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যার বৃদ্ধি'র হার খুবই চিন্তার কারণ । 
সবচেয়ে বড় কথা এই যে সব দেশ - এমনকি আমেরিকা আর ব্রাজিলকে - টপকে নতুন করোনা আক্রান্তের সংখ্যায় ভারত এখন সবার ওপরে ! টোটাল আক্রান্তের সংখ্যায় ওরা অবশ্য এখনো এগিয়ে তবে যে ভাবে আমরা লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছি ধরে ফেলব। কবির কথা টেনে এনে  'ভারত আবার জগৎ সভায়...'
ছবি ২: করোনা আক্রান্ত'র তালিকায় সবচেয়ে ওপরে যে তিনটি দেশ।  ২০শে অগস্ট অবধি প্রতি সপ্তাহে নতুন কেসের খতিয়ান।
 ভারতের অবস্থা উদ্বেগজনক। Our world in data site থেকে নেওয়া 
২. খেলার ছলে বলছি, কিন্তু এ যে কত বড়  চিন্তার  কারণ  সে বিষয়ে কোন সন্দেহ আছে কি? এবং আরো বেশি দুশ্চিন্তা এই কারণে যে পরীক্ষা বাড়লেও জনসংখ্যার নিরিখে পরীক্ষায় ভারত এখনো অনেক পিছিয়ে। সুতরাং যথেষ্ঠ টেস্ট হলে যে সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে....!!?? অবশ্য,  প্ল্যান করে না  করলে কোন বিজ্ঞান যে কাজ করে না এটা বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রই জানেন, এবং তাই মার্চ মাসের হঠাৎ-লকডাউন যে রোগের বাড়বাড়ন্ত ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে তাতে দুঃখ পেলেও, অবাক হবার বেশি কিছু নেই।

৩. অনেকেই হয়ত বলবেন - আরে আমাদের জনসংখ্যা অনেক বেশি। সেই তুলনায় কিছুই হয়নি । কিন্তু, এটা যে কোন সান্তনা নয়, সেটা চূড়ান্ত অজ্ঞ ছাড়া সবাই বুঝি। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে   covid হলেও প্রায় ৮৫% লোকের এমনিতেই সেরে যায়, এবং বাকি ১২-১৫% হাসপাতালে ভর্তি হলেও তাদের মধ্যে ~ ২% ছাড়া সবাই সুস্থ হয়ে ওঠেন। ঠিক।  কিন্তু, যে  জীবাণু এত ছোয়াঁচে সেই রোগের ২-৩% ও একটা বিশাল সংখ্যা এবং তার  মানে হাজার হাজার হাসপাতাল বেড আর আইসিইউ লাগবে।  এবং আমাদের মত দেশের দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা  যে এর সঙ্গে লড়াই করতে পারবে না সে কথা সবাই বুঝি। তাছাড়া জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ অন্তত দু মাসের প্রস্তুতি-পর্ব আমরা প্রায় পুরোই অবহেলা করেছি ; আজ সেই সময় তো আর ফিরবে না, তাই না?

৪. এটা শুধু কথার কথা নয়। করোনায়  আক্রান্ত কতজন মারা গেছেন এই নিয়ে আমাদের বড়াই করার কিছু নেই।  কারণ  ইতালি বা আমেরিকার থেকে সেই সংখ্যা % কম হলেও, এই গ্রাফ দেখুন -  প্রতিবেশী দেশরা অনেকেই কিন্তু আমাদের থেকে বেশি রুগীকে সুস্থ করে তুলেছেন।  ১০০০ জন আক্রান্ত হলে ১৯ ভারতীয় মারা যাচ্ছেন, এবং সমসংখ্যক আক্রান্ত হলে প্রাণ হারাচ্ছেন ১৩ জন বাংলদেশী ও ৪ জন নেপালি।আর  পাকিস্তান আর আফগানিস্তান আমাদের থেকে বেশি এটা নিশ্চয়ই গর্ব করার মত কিছু না।
ছবি ৩: ভারত ও প্রতিবেশী দেশে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে কত শতাংশ মারা গেছেন।পরিসংখ্যানবিদ রিজো জনের টুইট থেকে নেওয়া।  
  ৫. সারা দেশেই কি এই অবস্থা? এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তলার ছবি ও গ্রাফ এ বিষয়ে বেশ কিছুটা আলোকপাত করছে।দেশের বিভিন্ন অংশে আজ অবধি করোনা'র প্রাদুর্ভাব কেমন সেটা এই ছবিটা দেখাচ্ছে।
ছবি ৪: ভারতের বিভিন্ন অংশে করোনা'র প্রাদুর্ভাব। 


মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিল নাড়ু, অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা যে অবস্থা অত্যন্ত চিন্তাজনক তা দেখাই  যাচ্ছে। এছাড়া দিল্লি, উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিস্তীর্ন অঞ্চল, দক্ষিণ বঙ্গ এবং গুয়াহাটির চারপাশ যথেষ্ট সংখ্যায় রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।

(covid19india.org,  যাঁরা এই অতিমারীতে অসাধারণ জন সংযোগের কাজ করেছেন, তাঁদের ওয়েবসাইট থেকে এই ছবিটা নেওয়া)  .










৬. পরের ছবি নেওয়া হয়েছে পরিসংখ্যানবিদ রিজো জনের টুইট থেকে। ওঁর উপস্থাপনা আমার খুব ভাল লাগে, এবং তাই ছবিগুলো ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে নিয়েছি।
ছবি ৫: বিভিন্ন  রাজ্যে দৈনিক পসিটিভ (২১শে অগস্ট) আর সাপ্তাহিক বৃদ্ধি% . পশ্চিমবঙ্গের স্থান তীরচিহ্ন দিয়ে দেখানো আছে।  
বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে যে কনফার্মড পসিটিভ কেসে  মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িষ্যা এবং বিহার এগিয়ে। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রে একাই ২০% কেস! কর্নাটকে  প্রায় ১১% ! 

কিন্তু ডানদিকে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা নিয়ে উদ্বেগ বেশি তবু কম নয়।  এক সপ্তাহে  করোনার প্রাদুর্ভাব ক' শতাংশ বাড়ল তার হিসেবে দিচ্ছে।এবার লক্ষ্য করুন -  ছত্তীসগঢ়, পাঞ্জাব, মেঘালয় , চন্ডিগড়, পন্ডিচেরী, কেরল, ওড়িশায় এবং ঝাড়খণ্ডে বেশ জোরে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা।তার মানে মাত্র এক-দেড় মাস আগে যেসব রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কম ছিল তারাও এবার আর তাল সামলাতে পারছেন না। বাংলার মানুষ এই চার্ট দেখে একটু আশ্বস্ত হতে পারেন যে  সেই তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ একটু বেটার অবস্থায় আছে, যদিও সেটা নিয়ে সন্তুষ্ঠ হবার তেমন কিছু নেই। কেন সেটা পরে বলছি।  

. তবে আরো তথ্য দেবার আগে একটা জিনিস জানাই। আমেরিকার বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক (তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ভারতীয় আছেন) সম্প্রতি সমীক্ষা চালিয়েছেন যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে করোনা-সংক্রান্ত রিপোর্ট কেমন করা হচ্ছে - বিশদ তথ্য দেওয়া হচ্ছে না অনেক ফাঁক-ফোকর থাকছে, ভালো ভাবে দেওয়া হচ্ছে নাকি দায়সারা ভাবে কাজ সারা হচ্ছে। তাঁদের গবেষণা পরিষ্কার দেখিয়েছে যে কিছু রাজ্য যেমন যথেষ্ট দক্ষতার ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এই কাজ করছেন , তেমনি আরো অনেকের কাজ মোটেই সন্তোষজনক নয়।  তলায় গ্রাফ সেই গবেষণাপত্র থেকে নেওয়া। 
ছবি ৬:  ভারতীয় রাজ্যদের covid সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপনার ওপরে স্ট্যানফোর্ড উনিভার্সিটির গবেষকদের তৈরী 'মার্কশীট' 
দেখতেই পারছেন কর্ণাটক, কেরল, ওড়িশা বেশ 'ভাল মার্ক্স' পেয়েছে। কারন তাঁদের দৈনিক বুলেটিন এবং dashboardএ প্রচুর তথ্য দেন। পশ্চিমবঙ্গ আর মহারাষ্ট্র মোটামুটি (কারন, পশ্চিমবঙ্গ গত দু-তিন মাসে দৈনিক বুলেটিন অনেক উন্নত করলেও এখনো কোন জেলায় কটা টেস্ট হল, আক্রান্তদের মধ্যে জেলাভিত্তিক নারী-পুরুষ, বয়েসের হিসেবে, ইত্যাদি বুলেটিনে দেয় না; দেওয়া উচিত)। অবশ্য  অন্য রাজ্যেরা আরো তলার দিকে - আর খুব খারাপ 'মার্ক্স' পেয়েছে উত্তর প্রদেশ আর বিহার! স্ট্যানফোর্ড গবেষকরা আফসোস  করেছেন যে কিছু রাজ্য অফিসিয়াল বুলেটিন না করে টুইটারে কিছু সংখ্যা দিয়ে দেন !! ঠিকঠাক পরিসংখ্যানের পক্ষে, চিকিৎসা ব্যবস্থার পক্ষে সেটা মোটেই ভাল নয়। 

৮.   এর সঙ্গে আরেকটা 'সমস্যা' হয়েছে।  এতদিনে আমরা সবাই জানি যে টেস্ট মূলত হয় দু রকমের - RT-PCR আর rapid antigen test. করোনা লড়াইয়ে দুটোই প্রয়োজনীয় , কিন্তু RT-PCR হল সত্যিকারের মাপকাঠি। যাকে বলে gold standard. ঠিকঠাক করে করলে এতে >৯০% সঠিক উত্তর আসবে।  এন্টিজেন টেস্ট ও ভাল, দ্রুত করা যায়, বিশেষ ল্যাব লাগে না, কিন্তু এতে যেমন কেউ আক্রান্ত কি না বোঝা যায় (true positive) তেমনি অনেক সময় আক্রান্ত হলেও ধরা পড়ে না (false negative)। তার মানে এই নয় এন্টিজেন টেস্ট করা উচিত না।  তাই দেশ বা কোন  রাজ্য যদি এন্টিজেন টেস্ট'র ওপরে  বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখনই মুশকিল হতে পারে - কারন তখন অনেক পসিটিভ ধরা না পড়তে পারে। মুশকিল হচ্ছে, নানা কারণে বেশ কিছু রাজ্য এখন খুব বেশি এন্টিজেন টেস্টিং করছেন এবং  RT-PCR test সেই অনুপাতে অরে বাড়ছে না।  যেমন ওড়িশার নাকি এখন ৯০% পরীক্ষা হল এন্টিজেন টেস্ট ! কয়েকদিন আগে দিল্লীর হিসেবে বলছিল ৭০-৭২% টেস্ট এন্টিজেন টেস্ট। বিহার এবং উত্তর প্রদেশও বেশি এন্টিজেন টেস্ট করছে বলে খবর।  

৮. পশ্চিমবঙ্গ ? দৈনিক বুলেটিন অনুযায়ী এ রাজ্যে এন্টিজেন টেস্ট শুরু হয়েছে ২৮শে জুলাই থেকে। এই টেবিলে আছে অগস্টের হিসেব।  দেখুন। 
টেবিল ১ : প্রতি দুদি ন অন্তর পশ্চিমবঙ্গে RT-PCR আর Antigen (Ag) testর হিসেব। অগস্ট মাসে এন্টিজেন টেস্ট হচ্ছে ~৩৮%   
তার মানে দাঁড়াল - এক, পশ্চিমবঙ্গও এন্টিজেন টেস্ট বাড়িয়েছে কিন্তু অতটা না।  ৩৭-৪০% রেঞ্জে চলছে।  কেরল ও তাই।  আর এর পাশাপাশি RT-PCR  টেস্ট ও বেড়েছে।  নতুন ল্যাবও join করেছে। অনেক জেলায় এখন ল্যাব চালু হয়েছে।  খেয়াল রাখতেই হবে এই রাজ্য যেন এন্টিজেন টেস্ট ওপর বেশি নির্ভর না করতে শুরু করে; কারণ  তাতে কিছুদিন রেসাল্ট 'ভাল দেখালেও' পরে বিপদ বাড়বে বই কমবে না !  এবং গতকালই পড়লাম যে কলকাতায় যত পরীক্ষা করা উচিত তত হচ্ছে না।  কেন হচ্ছে না, কি হচ্ছে সেই নিয়ে পুরসভা, স্বাস্থ দপ্তর, নবান্ন সবার মধ্যে কথাবার্তা চললেও মোদ্দা কথা আরো RT-PCR পরীক্ষা বাড়াতে হবে। এর মধ্যে আবার গত সপ্তাহে খবর ছিল যে NICEDএ যে নতুন COBAS-8000 মেশিন বসানো হল (প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল উদ্বোধন করলেন) সে গোড়াতেই কাজ করছে না!? অবশ্য, অভিজ্ঞতা থেকে জানি নতুন যন্ত্র এলেই এরকম কিছু না কিছু গন্ডগোল কিছুদিন লেগে থাকে, কিন্তু এই 'যুদ্ধকালীন' পরিস্থিতিতে সেটা যাতে দ্রুত solve হয় সেটাই বাঞ্চনীয়।  

৯. মুশকিল হয়েছে এই দুটো কারনে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে তুলনামূলক analysis করা বেশ অসুবিধেজনক হয়ে উঠেছে। সবাই তো একভাবে (অথবা মোটামুটি একভাবে) তথ্য দিচ্ছে না, টেস্টও  করছে না।  তাহলে পাশাপাশি ফেলে ডিটেলে বুঝবেন কি করে? আর এটা 'আমরা ওরা' করার জন্যে  না।  ভাইরাসের গতিপ্রকৃতি বুঝতে এ খুবই  প্রয়োজনীয়।

১০. রাজ্য থেকে জেলায় আসি। এই দেখুন। ভারতের যে ৫০টি জেলায় করোনার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি তাদের সংখ্যার ওঠা-নামা। বড় শহর ছাড়িয়ে জেলা, গ্রামগঞ্জে covid যে ছড়িয়ে পড়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। পুনে, মুম্বাই, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর, লক্ষনৌ , নাগপুর, আমেদাবাদ সব জায়গায় বাড়বাড়ন্ত। দিল্লীতে আক্রান্তের সংখ্যা গত সপ্তাহ দুই তিন কম ছিল (যদিও অত বেশি এন্টিজেন টেস্ট থেকে ঠিক হিসেবে পাওয়া যায় কিনা সেই নিয়ে একদল বিশেষজ্ঞ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন), কিন্তু, আবার সংখ্যা বাড়ছে। 
ছবি ৭ (ওপরে এবং নীচে ): ভারতের যে ৫০টি রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। রিজো জনের টুইট থেকে নেওয়া।

১১. প্রথম পঞ্চাশের মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের তিন জেলা - কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা আর হাওড়া। তাহলে সেই সূত্র ধরে আমরা এই রাজ্যের জেলাগুলির অবস্থা দেখি। প্রথমেই একটি টেবিল -  রাজ্যের মোট  পজিটিভের কোন জেলায় কত শতাংশ আছেন ? তিনটে সময়সীমা নেওয়া হয়েছে - ১৮ই জুলাই অবধি,  ৩রা অগস্ট অবধি আর ২২শে অগস্ট (গতকাল) অবধি। তাহলে এও দেখা যাবে যে কোন জেলায় আক্রান্তের আপেক্ষিক সংখ্যা বেড়েছে বা কমেছে বা একই রকম আছে।
টেবিল ২: রাজ্যের ২৩টি জেলায় মোট আক্রান্তের %. 


ছবি ৮: পশ্চিমবঙ্গের করোনা আক্রান্ত মূল অঞ্চল 
১২. প্রথমেই যেটা নজরে আসে যে কলকাতা এবং কলকাতা ঘিরে যে ৪টি জেলা করোনা এখনো মূলত এখানেই সীমাবদ্ধ। হ্যাঁ, এখনো। ২২শে অগস্টের হিসেবে বলছে যে কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর আর হুগলি থেকেই আছেন টোটাল আক্রান্তের ৭২% । এর মধ্যে কলকাতা + হাওড়া +  উত্তর ২৪ পরগনা মিলিয়েই হয় ৫৬% রুগী !! তার মানে আজ ছ'মাস পরেও এই অসুখ মূলত (মূলত) দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ। তার মানে আজও যদি এই অঞ্চলের প্রসাশন এবং সব নাগরিক  বিজ্ঞান-সচেতন হয়ে, লোভী না হয়ে, একজোট হয়ে লড়াই করেন এই রাজ্য covidকে অনেকাংশে পরাস্ত করবে। কথার কথা নয়, পরিসংখ্যান তাই বলছে।  

১৩.আর এই ট্রেন্ড তো দেশের অন্য জায়গার সাথে মিলছে - দিল্লী, মুম্বাই, চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর সবই তো রোগের epicentres [  হায় হায় ! ফেব্রুয়ারির শেষে ১৫টা এয়ারপোর্ট বন্ধ করে দিলে এই বিপদ আজ আসে না !!] 

১৪. কিন্তু, খুব দ্রুত এই কাজ করতে হবে। কারণ অন্য ২০টি জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা slow but steadily বাড়ছে। তলার টেবিল দেখুন। জেলায় জেলায়  গত ১০দিনে করোনা আক্রান্ত কত % বেড়েছে।  দেখা যাচ্ছ - দুই মেদিনীপুর, পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ দিনাজপুর আর আলিপুরদুয়ার  বৃদ্ধির হার রাজ্যের গড় বৃদ্ধির তুলনায় যথেষ্ট বেশি। নদীয়া আর জলপাইগুড়ি বাড়লেও কম;  দক্ষিণ ২৪ পরগনায়, দার্জিলিং, মালদা , হুগলিতে  বৃদ্ধির হার কম হলেও যেহেতু তাদের টোটাল আক্রান্তের সংখ্যা ওপরের দিকে সেটা চিন্তার বিষয় এবং contact tracingর উন্নতি দরকার। বীরভূম, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া আর কালিমপং সংখ্যা এখনো কম - সেটা ভাল।   আর  উত্তর ২৪ পরগনা আর কলকাতা যে এখনো চিন্তার বড় কারন সে  আমাদের সবারই জানা। দুই টেবিল দেখে  মনে হচ্ছে  কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনা উন্নতির পথে।  হতে পারে, তবে এই দুই জেলা যেহেতু খুবই ঘন বসতিপূর্ণ, লোকডাউন আর নেই এবং টেস্ট  এবং contact tracing বাড়লেও আরো অনেক বাড়াতে হবে,  তাই %র হ্রাস সত্যিই উন্নতি না টেস্টের লিমিটেশন সেটা অন্তত আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, এবং জেলাভিত্তিক কত টেস্ট আর তার মধ্যে কত পসিটিভ না জানলে সেটা বলা যাবেও না।উন্নতি সম্ভবত হয়েছে না হলে ছবি ৭ ও টেবিল ২ আর ৩এ তা  ধরা   পড়ত কিন্তু 'গা ছাড়া' দেবার ভাব যেন একদম না আসে।  লক্ষ্য করুন দিল্লী কিরকম আবার বাড়ছে !  
 টেবিল ৩: গত দশ দিনে বিভিন্ন জেলায় covid আক্রান্তের বৃদ্ধির হার। 

১৫. ভাল খবর কি কিছু নেই? আছে,  হাওড়া জেলা নিজেদের কিছুটা রক্ষা করেছেন।অন্তত সাময়িক ভাবে আক্রান্তের % কমছে, এবং খবরের কাগজের রিপোর্ট ও তাই বলছে। আরো  আছে। ৭৭% রুগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন এ যে কি আনন্দ ও স্বস্থির কারন সেটা কি লিখে বোঝাতে হবে ? আর এপ্রিল-মে মাসে যে মৃত্যুহার অস্বাভাবিক রকম বেশি ছিল ( তখনই বলেছিলাম ওটা কম টেস্ট করার জন্যে error হচ্ছে) সেই মৃত্যুহার আজ জাতীয় গড়ের মাথায় মাথায় (তলায় গ্রাফ দেখুন)। অবশ্য যে দেশের ৩০%র কম মৃত্যুর ঠিকঠাক কারণ জানা যায়, সার্টিফিকেট পাওয়া যায় সেই দেশে অতিমারীর সময় কি হয় তা নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞ সন্দেহ করেছেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে এত শত প্রতিকূলতার মধ্যে রাজ্যের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন এবং তাঁদের  কাছে আমরা সবাই ঋণী। 
১৬. আচ্ছা, অন্য জেলায় রোগ ছড়িয়ে পড়ছে কেন? এর কিছু উত্তর আমরা সবাই জানি - ভারত প্রস্তুত ছিল না (না হলে WHO অতিমারী ঘোষণা করার দুদিন পরে  কেন্দ্রীয় স্বাস্থ মন্ত্রক কখনো বলে যে চিন্তার কারন নেই????  ) , আমাদের বিধিনিষেধ অত জোরালো নয়, সামাজিক অর্থনৈতিক সাপোর্ট নেই,  আর বহু লোকজন এখনো হিরোগিরি মেরে থুতনির তলায় মাস্ক পরেন, ইত্যাদি। তবে সেসব ছাড়াও বড় কারণ আছে।  সেটা দেখা যাক।  

১৭. এই দেখুন তলার গ্রাফে পশ্চিমবঙ্গের জেলা - মে মাস থেকে আজ অবধি।প্রথমে বাঁদিকটা দেখুন। মে মাসের শেষ অবধি সব পজিটিভের ৮৪% ছিল মাত্র ওই তিন হটস্পট জেলা থেকে। বাকি ২০ জেলা মিলিয়ে ছিল ১৬-১৭% ! ভাবতে পারেন!! সেই থেকে আজ অগস্টের শেষে এসে ওই ২০টা জেলা - যদিও এক একটি ২-৩%র বেশি হবে না - থেকে আসছেন ৪০%র বেশি করোনা আক্রান্ত। 
ছবি ৯: মে মাস থেকে অগস্ট অবধি পশ্চিমবঙ্গের জেলায় করোনা পরিস্থিতি।  
১৮. এরকম হল কেন ? মনে করে দেখুন মে'র শেষ আর জুনের গোড়ার দিকে দেশ জুড়ে কি হয়েছিল। রোজগার, থাকার জায়গা সব হারিয়ে লক্ষ লক্ষ ক্লান্ত-শ্রান্ত শ্রমিকের ভিড় ট্রেন করে, বা কয়েকশো কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফেরাদেশভাগের পরে এমন যন্ত্রনা এতজন ভারতবাসী সহ্য করেছেন কি না জানা নেই, তবে  বিজ্ঞানী মহল তখনই সতর্ক করেছিলেন যে করোনা এবার দূরদূরান্তে, শহর আর সদর থেকে আরো গভীরে গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়বে। তাছাড়া, ভুললে চলবে না , এই রাজ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি ভয়ঙ্কর জিনিস এসেছিল - সাইক্লোন আম্ফান।  এই গ্রাফ সেই কথাই বলছে।  

১৯. অবশ্য এটাও ঠিক যে এখন অনেক জেলায় টেস্ট বেড়ে যাবার জন্যে ওখানকার রিপোর্ট বেশি আসছে (১০ই মে ছিল ১৮টি ল্যাব, আজ ২৩শে অগস্ট ৭০টি ল্যাব কাজ করছে ) . কিন্তু,  তা দিয়ে এই ১৫% থেকে ৪২% র ব্যাখ্যা  হয় না।  আর তাছাড়া, এত তো শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয় -  কর্ণাটক, কেরল , বিহার নানা রাজ্যে একই চিত্র। যেখানেই যখন লোকজন বেশি ট্রাভেল করেছেন সেখানেই পসিটিভ বেড়েছে। এত সোজা হিসেবে - লোকডাউনের সময় তো কারুর চলাফেরার কথা নয়।এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্য নয়ই।  যাতায়াতই যদি হয়  তাহলে কিসের লোকডাউন? তাই, যাঁদের রোজগার বন্ধ তারা থাকা-খাওয়া-ইত্যাদির সব সরকারি সুবিধে পাবেন এটাই expected . নোবেল বিজয়ী অভিজিৎবাবু দেশকে সেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। মানা হয়নি, আর আজ তার ফল দেখতেই পাচ্ছেন।

২০. তা সত্ত্বেও আবার বলব এখনো পশ্চিমবঙ্গের সিংহভাগ করোনাআক্রান্ত এই কলকাতা-কেন্দ্রিক ৫টি জেলার মধ্যে আছেন। দ্রুত টেস্ট বাড়িয়ে এবং কন্টাক্ট ট্রেসিং করে এখনো অন্য জেলাদের খুব উন্নত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যায়।  আর তাহলে ঐসব জেলার হাসপাতালের ওপরেও অনেক কম চাপ পড়বে। আর  কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনাকে আরো কি করা যায় সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মতামত নিতে হবে বিশেষ করে।  সম্ভবত সারা রাজ্যে না করে শুধু এই দুটি জেলা নিয়ে কিছু বিশেষ ব্যবস্থা নিলে হয় কি?


 ২১. গতকাল একটা খবর পড়েছিলাম, সেটা দিয়েই শেষ করি। এই যে - 
 রিপোর্টে বলছে - 'শহরের ২০টি কনটেনমেন্ট জোনের মধ্যে ১৭টিই আবাসন। বাকিগুলির মধ্যে দু'টি বস্তি ও একটি ব্যক্তিগত বাড়ি রয়েছে।....কলকাতায় বর্তমানে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে বিভিন্ন আবাসনের বাসিন্দারাই সংখ্যাগুরু, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৭২%। .... পুরসভা সূত্রে খবর, এর মধ্যে গত দু' সপ্তাহে বস্তি এলাকার মাত্র ১৫% মানুষ সংক্রামিত হয়েছেন। পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, আবাসনে আক্রান্তের সংখ্যাটা এর প্রায় পাঁচ গুণ।.... জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অমিতাভ সরকার বলেছেন, 'বস্তির বাসিন্দারা আক্রান্ত হলেই পুরসভার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ফলে রোগটা আর ছড়াতে পারছে না।' কিন্তু আবাসনের বাসিন্দাদের অনেকে রোগ লুকিয়ে সামাজিক মেলামেশা চালিয়ে যান বলে বিষয়টা উদ্বেগের হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ স্বাতী নন্দী চক্রবর্তীর বক্তব্য, 'আবাসনের উপসর্গহীন বাসিন্দারা ছাদ কিংবা লিফট ব্যবহার করছেন। অসুখটা সম্পর্কে হয়তো অন্যদের জানাচ্ছেনই না! ....বস্তির বাসিন্দাদের অধিকাংশই দৈনিক মজুরির কাজে যুক্ত। সম্ভবত সেই কারণে দিন-আনা-দিন-খাওয়া এই মানুষরা বিধি মেনে চলার ব্যাপারে অনেক বেশি সাবধানী। তাই বেলগাছিয়ার বস্তিতে কিছু দিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণও করা গিয়েছে করোনার ভয়াল প্রকোপ। কিন্তু অভিজাত আবাসনে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। একে তো বাসিন্দাদের একটা বড় অংশ বেপরোয়া বলে মত বহু বিশেষজ্ঞের। অনেক সময়ে আবার তাঁরা পুরসভার লোককে বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকতে পর্যন্ত দেন না। অর্থাৎ, নিজেরা তো বিধি মানেনই না, উল্টে পুরসভার কাজেও অসহযোগিতা করেন। পরিণাম যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে।...'

 রাশি রাশি ডিগ্রী নিয়ে যদি এই হয়  .....!!! আর সবাই তো করেন না;  অনেকই  সব নিয়ম মেনে চলেন, কিন্তু যাঁরা পাকামো মেরে মানেন না তাদের জন্যেই বিপদ ছড়ায়। আমিও তো সাধারণ নাগরিক , কি আর বলতে পারি - তবে এটা সাবধান করতে পারি যে এক, সারা পৃথিবীতে অতিমারীর দ্বিতীয় ঢেউ কম বেশি শুরু হয়েছে বা হচ্ছে, আর দুই, পুজো আসছে, পূজোর ভিড় আসছে আর সর্দি-কাশি-জ্বর অসুখের মরশুম শীতকালও বেশি দূরে নেই।   

রেফারেন্স 







Wednesday, August 12, 2020


করোনা বিজ্ঞানের খুচরো খবর - পুটিনের ভ্যাকসিন।
ব্যাপারটা ঠিক কি দাঁড়াল ? 
পুটিন-দা পারেন ও বটে।  এই গত মাসেই আমাদের এখানে কত লাফালাফি হল যে ১৫ই অগস্ট নতুন ভ্যাকসিন আসছে। রে রে পড়ে গেল। মনে আছে নিশ্চয়ই তখন সবাই - এমনকি যে বিজ্ঞানী মহল সাধারণত কোন কথাই বলেন না এমনকি তাঁরাও - প্রতিবাদ করলেন, বোঝালেন যে 'না না এভাবে হতে পারে না। এরকম তাড়াহুড়ো করে টেস্ট না করে ভ্যাকসিন ছাড়া যায় না।  ...হাত চালিয়ে  ব্যাটিং করা যেতেই পারে, কিন্তু চোখ-কান বুজে দুম-দ্বাড়াক্কা ব্যাট চালালে লং অনে ক্যাচ দেবার চান্স প্রায় অবধারিত'। তা ভাল, চাপে পড়ে বা যাই হোক সেই লাফালাফি একটু থেমেছে অমনি রাশিয়া থেকে খবর এল যে ভ্যাকসিন প্রস্তুত।
কয়েকদিন ধরেই অবশ্য এরকম খবর বাজারে চলছিল। মানে ওরা টুকটুক করে news feelers ছাড়ছিল।  গত এক সপ্তাহে অন্তত ৪ জন আমায় এটা জিজ্ঞেস করেছেন। আমি বলেছি - না সম্ভব না, এবং এখনো বলছি সম্ভব না।  মানে, বিজ্ঞানের ঠিকঠাক নিয়ম মেনে সম্ভব না, নিয়ম না মানলে, আমার-দেশ-আমার-ল্যাবরেটরি-আমার-যা-ইচ্ছে-করব করলে তো  অন্য কথা - সে তো রাজনীতির ব্যাপার, শুধু তো বিজ্ঞান নয়। ' তবে, আজ পুটিন-দা সেটা নিজে ঘোষণা করার পরে ব্যাপারটা একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে বইকি।
তাহলে খবরটা ঠিক কি দেখে নেওয়া  যাক।  রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুটিন নিজে জানিয়েছেন যে মস্কোর বিখ্যাত গামালেয়া ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলোজি এন্ড মাইক্রোবায়োলোজি যে করোনাবিরোধী ভ্যাকসিন তৈরী করছিল সেগুলি এখন পরীক্ষিত,  রোগ প্রতিরোধে সফল , নিরাপদ এবং তাই তিনি এটি অনুমোদন করছেন - এবার প্রোডাকশন অনেক বাড়ানো হবে , অক্টবর মাস নাগাদ এই টিকা রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারবেন, বিদেশেও রপ্তানি হবে। রুশ আধিকারিকরা জানাচ্ছেন অন্তত ২০টি দেশ এই ভ্যাকসিন চেয়েছে।
ভ্যাকসিন যে নিরাপদ সেটা বোঝাবার জন্যে পুটিন জানিয়েছেন যে তাঁর নিজের মেয়ে এই ভ্যাকসিন পরীক্ষার একজন ভলিন্টিয়ার হয়েছিলেন, এবং সে ভালোই আছে।
ভ্যাকসিনটা সম্পর্কে একটু বলে দিই।গবেষণার সময় এর কোড নাম ছিল Gam-Covid-Vac-Lyo।  এখন পোশাকি নাম  'স্পুটনিক ভি'।   দুটি সাধারণ ঠান্ডা লাগা (common cold) ভাইরাস Adenovirus Ad5 এবং Adenovirus Ad26র মধ্যে নতুন কোরোনাভাইরাসের জীন ঢুকিয়ে এই ভ্যাকসিন তৈরী করার চেষ্টা হয়েছে। গত মাসে যে দুটি ভ্যাকসিন নিয়ে খুব আলোচনা হল Oxford/AstraZeneca এবং Cansino তারাও মোটামুটি একই পদ্ধতিতে গবেষণা করেছেন।
তাহলে অসুবিধেটা কি? সমস্যা হল - যে কোন ভ্যাকসিন তৈরির কয়েকটা সুনির্দিষ্ট পর্যায়  থাকে। যাকে বলা হয় phase 1 , phase 2, phase 3....সেগুলো ঠিকঠাক বিজ্ঞানসম্মত ভাবে অতিক্রান্ত করলে,  এবং সব ফলাফল নিজে পর্যালোচনা করে সেই রেসাল্ট কোন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের জার্নালে পাঠাতে হয়। সেই জার্নালের সম্পাদক তখন ওই বিষয়ের অন্য এক্সপার্টদের অনুরোধ করেন, 'এই ফলাফল অমুক ল্যাবরেটরি থেকে এসেছে। আপনারা নিজে থেকে দেখুন যা পাঠিয়েছে সেসব ঠিক তো, বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে তো, হিসেবে সব মিলছে তো'; একে বলে peer review বা ওই বিষয়ের জ্ঞানী ব্যক্তিকে দিয়ে মূল্যায়ন করা। সাধারণত দুই বা তিনজন রিভিউ করেন, তাঁদের মতামত জানান। হয়ত বললেন,  'দেখেছি, ঠিক আছে। লজিক আছে, গুল-তাপ্পি মারেনি।  আপনি নিশ্চিন্তে পাবলিশ করতে পারেন।', অথবা বললেন, 'না, আরো এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে, রেসাল্ট আছে তবে আরো প্রমান চাই' . তখন সম্পাদক জানিয়ে দেবেন সেই কথা।  মোদ্দা কথা - আপনি যে বৈজ্ঞানিক ভাবে ঠিক বলছেন তার প্রমান দিন, আরো অনেকে দেখবে, তবে সেটা গ্রহণ করা হবে। আপনি যতই বড় হনু হন শুধু মুখের কথা, বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে কাজ চলবে না, গবেষণার ফল দেখতে চাই।  এই ভাবে সারা পৃথিবীতে সব বিজ্ঞানী কাজ করেন।
কিন্তু এত নতুন গবেষণা ? এক্সপার্ট জানছেন কি করে ঠিক কি ভুল? উপমা দিলে - গাভস্কারকে কি মাঠে নেমে টি-২০ খেলে বুঝতে হয় খেলাটার মূল গতিপ্রকৃতি, ঠিক ভুল কি হচ্ছে? না শ্রীকান্ত আচার্য যখন গানের কম্পিটিশনের জজ হন তখন উনি হিন্দি গান নিয়ে সুচিন্তিত মতামত দেন না? জ্ঞান, অভিজ্ঞতা থেকে ধাঁচ গতিপ্রকৃতি বোঝা যায়। এখানেও একই ব্যাপার।
তবে এতে কি ভুল হবার সম্ভবনা নেই? নিশ্চই আছে; বিজ্ঞানীরাও তো মানুষ। ভুল হতে পারে, পরে আরো ভাল গবেষণা হতে পারে এবং তখন আগের রেসাল্ট কিছুটা পাল্টে যেতে পারে, আবার 'তুই আমার পেপার দেখে দিস আমিও তোরটা নিয়ে বেশি চুলকোবো না' সেসব তো হতে পারে। তবে, ঠিক যেমন কেউ শুধু সিলেক্টরের সাপোর্ট পেয়ে বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বা ফুটবল খেলতে পারে না, এখানেও তাই।  The scientific process is not 100% efficient, but it is certainly the most efficient of human processes. ভুল ভাল বকলে ধরা পড়বেই। বিজ্ঞানের এই পথ কঠোর ভাবে সত্যনিষ্ঠার পথ।  এখনো। 
ভ্যাকসিনের কথায় ফিরে আসি।  ভ্যাকসিন গবেষণার ক্ষেত্রে তাহলে বোঝাই যাচ্ছে ওই  phase1-3র ফলাফল রিভিউআররা দেখতে চাইবেন। তবেই  জার্নালে ছাপা হবে -  ঠিক যেমন Oxford/AstraZeneca এবং Cansinoর ভ্যাকসিন গবেষণা বিখ্যাত ল্যানসেট পত্রিকায় হয়েছিল। প্রথম দুই পর্যায়ের রেসাল্ট সারা পৃথিবী দিয়ে পাশ করিয়ে তবে তাঁরা জানিয়েছেন যে তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে/হচ্ছে। গামালেয়া'র ক্ষেত্রে মুশকিল হচ্ছে সেই সব কোন তথ্য নেই।
রুশ রেসাল্ট যে নেই বলছি কেন?
১. কারন কোন জার্নালে বেরোয়নি, বেরোলে তো জানা যেত।
২. এই স্ক্রিনশট-টা দেখুন। বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক কার্ল জিমার গত কয়েক মাস ধরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সংবাদপত্রে ভ্যাকসিন আপডেট দিচ্ছেন। কোন ভ্যাকসিন গবেষণার কি পর্যায়ে তা জানার জন্যে এ বেশ নির্ভরযোগ্য  সোর্স। সেখানে কি লেখা আছে দেখুন।রুশ ভ্যাকসিন  জুন মাসে মাত্র প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। জুলাই মাসেও রুশ পার্লামেন্ট আশা করেছিল যে এই বছরের শেষ নাগাদ ভ্যাকসিন তৈরী শুরু হবে, কিন্তু ১০ই অগস্ট পুটিন জানিয়েছেন যে তিনি অনুমোদন করেছেন।  জিমার জানাতে ভোলেননি যে গুরুত্বপূর্ন তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল এখনো বাকি।  কি বুঝলেন?
৩. শুধু জিমার নন, কোন ভ্যাকসিন কি পর্যায়ে কাজ চলছে সেটা WHO একটি টেবিল করে বুঝিয়ে দেয়।  এই যে, সেই টেবিলের কিছুটা অংশ কাট-পেস্ট করে দিলাম। দেখছেন , একই ব্যাপার। গামলায়ার টিকা  phase 1/2র বেশি এগিয়েছে বলে দু দিন আগে পর্যন্ত কোন আপডেট নেই।

৪. আর ওই টেবিল থেকেই রুশ ভ্যাকসিনের অন্দরমহলে পৌঁছে যাওয়া যায়। এবং সেখানেও দেখুন শেষ অবধি ওরা নিজেরাই যা জানিয়েছেন তা হল গবেষণা হয়েছে phase 1/2অবধি। phase 3র কোন উল্লেখ নেই।  সব মিলিয়ে পরীক্ষা হয়েছে ৩৮র জনের ওপর -  আর সেই পরীক্ষা শেষ হবার তারিখ ধরা হয়েছিল ১৫ই অগস্ট। 

৫. সবচেয়ে বড় কথা।  এই ভ্যাকসিনের জন্যে রুশীরা নিজেরাই একটি ওয়েবসাইট বানিয়েছেন।এবং তাঁদের ওয়েবসাইট বলছে যে ৩৮ জন ভলিউনটিয়ারের ওপর phase 1 and phase 2 পরীক্ষা ১লা অগস্ট সফল ভাবে শেষ হয়েছে।  , কিন্তু তারপর যে phase 3 হাজার হাজার লোকের ওপর নানা ভাবে এবং বেশ কয়েকমাস বা বছর ধরে পরীক্ষা হবার কথা তা ১২ই অগস্ট থেকে শুরু হবার কথা।   অথচ এর মধ্যে দুম করে উনি টিভিতে বসে বলে দিলেন 'সব রেডি - আমার মেয়েকে দিয়েছি, তার মানে সব সেফ' - যাববাবা  !

Summarize করলে কি দেখা যায়? 
 ১. রুশ ভ্যাকসিন প্রথম দুই পর্যায় মাত্র শেষ করেছে বলে জানিয়েছেন। তৃতীয় পর্যায় শেষ করা তো ভুলেই যান,  সেটা  যে ১২ই অগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে তা তারা নিজেরাই জানিয়েছেন।
২।  প্রথম পর্যায়ের ফলাফল তারা কোন জার্নালে প্রিভিউ করতে এখনো পাঠায়নি।
৩।  মাত্র ৩৮জন ভলান্টিয়ার নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে। সমপর্যায়ের অক্সফোর্ড/অস্ট্রজেনেকা এবং ক্যান সাইনো ভ্যাকসিন পরীক্ষা হয়েছিল ~১১০০ ও ~৬০০ জনের ওপর।

তাহলে কি দাঁড়াল ? শেষ হল কি হল না, রেসাল্ট সব ভাল করে দেখা হল কি না , লং টার্ম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি জানা হল না,  বয়স্ক লোকজন, হার্টের রুগী, ডায়াবেটিক, যাঁদের প্রেসার কিডনি ইত্যাদির সমস্যা আছে তাদের টিকা দিলে কেমন থাকবেন  জানা হল না, বাচ্ছাদের ওপর কি রেসাল্ট দেখা হল না!  মাত্র ৩৮জন লোকের ওপর গবেষণা করে , phase3  না করে উনি  'এই দেখ আমার মেয়ে দিব্যি আছে' বলে গ্যাস মেরে দিলেন? আরে পুটিনের মেয়ে হোক কি ট্রাম্পের মেয়ে কি ওবামার -  সেও তো একজন মাত্র মানুষ। তার বেশি তো কিছু না। আর একজন মানুষ, তিনি যেই হন, তিনি  তো একা ২০০০ মানুষের phase 3র  রেসাল্ট দিতে পারবেন না।তাই বলছি, ওটা জাস্ট সুড়সুড়ি। লোকে খাবে।  সব রুশ বাবা-মা (এবং সারা পৃথিবীর বহু বাবা-মা - ওই যে ২০টা দেশে রুশ ভ্যাকসিন যাবে) ভাববেন 'আহা , নিজের মেয়েকে এগিয়ে দিয়েছে। তার মানে সব ঠিক আছে।' এটা ঠিক পুটিন বাবা হিসেবে যা করেছেন সেটা খারাপ  বলছি না , এক দিক দিয়ে প্রশংসনীয় এবং অনেক বাবা মা'ই করবেন না।  তবে সেটা তো আর  সিরিয়াস  বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষা পাশ কাটাতে পারে না।এই কথাটা ভুললে চলবে না।   ( আচ্ছা একটা কথা।  পুটিনের মেয়ে।  কোন মেয়ে? পুটিনের তো দুই কন্যা  - মারিয়া আর য়েক্যাটরিনা।  কোনজন টিকা নিয়েছেন সেটা সংবাদ সংস্থা বলেনি।)
তার মানে কি এই ভ্যাকসিন কাজ করবে না? না , এমন কোন কথা নেই।  সত্যি বলতে কি, আজকের দিনে ভ্যাকসিন জিনিসটা বানানো যে খুব জটিল তা না।  সেটা কতটা ভাল কাজ করবে (মানে সংক্রমণ আটকাবে) আর বাজে সাঈড এফেক্ট হবে কি না সেটাই ভাল করে পরীক্ষা করতে হয়। সেখানেই সময় লাগে। আজকের দিনে এমন কোন ভ্যাকসিন হয় না যেটা একদম ফেল মেরে যাবে, আর সবার মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে।  আর গামালায়া তো বহুদিনের অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান।  সুতরাং, এত কিছু বলার পরে ও বলছি যে এই রুশ ভ্যাকসিন দুর্দান্ত না হলেও বেশ কিছুটা কাজ করবে। এবং খুব সম্ভবত ওরা টিকাকরণ আর তার ফলাফল কি হয় সেটা পাশাপাশি দেখতে থাকবেন। তবে, ওই যে - এইভাবে হড়বড় করা বিজ্ঞানসম্মত নয়।অনেকটা সাধারণ মানুষকে গিনিপিগ করার মত ।
পুতিন এটা কেন করলেন? একজন সাংবাদিক বন্ধুকে একটু আগে জিজ্ঞেস করলাম - পুটিনের ওপর কি রাশিয়ার ভেতরে খুব চাপ চলছে? লোকজন খুব বেশি অসুন্তুষ্ট। উনি বললেন (এবং আমিও মোটামুটি তাই জানি ) যে ছোটখাট সমস্যা আছে, রাশিয়ায় অনেক লোক করোনা -আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু পুটিন রাজনৈতিক ভাবে খুবই পরাক্রমশালী। এমন কিছু চাপে নেই।  তাহলে? তাহলে একটাই উত্তর হয়।  উনি সারা পৃথিবীকে দেখাতে চাইছেন - দেখ, কি তোমরা অক্সফোর্ড অক্সফোর্ড , আমেরিকা আমেরিকা , চীন চীন করছ ? সবার আগে আমরা।  আর সম্ভবত এই জন্যেই ভ্যাকসিনের নাম দিয়েছেন স্পুটনিক। মনে আছে নিশ্চই ১৯৫৭ সালে মহাকাশে যাত্রা করা  প্রথম স্যাটেলাইট ছিল  সোভিয়েত  ইউনিয়নের 'স্পুটনিক'.  আমাদের স্কুলের পরীক্ষায় সেই যে কোশ্চেন আসতো -  'নামকরণের স্বার্থকতা', সেই ব্যাপার।

আমাদের কি? তেমন কিছু মনে হয় না। তেমন কোন ডাইরেক্ট খবর নেই। তবে বহুদিনের বন্ধু দেশ রাশিয়ার থেকে কিছু ভ্যাকসিন হয়ত আসবে (এই তো কয়েকদিন আগে কিসব অস্ত্র কেনা হল, চীনের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে রাশিয়া মধ্যস্ততা করল।  এইসব সম্পর্ক এভাবেই থাকে)  তবে সে যাই হোক,  যেটা নিয়ে একটা খেয়াল রাখতে হবে - আমাদের দেশে যা ভ্যাকসিন ছাড়া হবে সেটা যেন একদম নিয়ম মেনে ভাল করে পরীক্ষা করেই হয়। Phase 3তে যেন কোন তাড়াহুড়ো ঢিলেমি না থাকে।  'ফাটিয়ে দেব' 'সবাইকে দেখিয়ে দেব, তাক লাগিয়ে দেব' ওসব সিনেমায় হয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানে হলে কেলেঙ্কারির চান্স খুব বেশি। একেই গবেষণা অত্যন্ত দ্রুত চলছে। কিন্তু সব কিছুর একটা লিমিট আছে - একজন মহিলার একটি সন্তানকে জন্ম দিতে ৯ মাস লাগবে।  সেটাই স্বাভাবিক, এবং আর কোন রাস্তা নেই।  ওই কাজটা একসঙ্গে ৯জন মহিলা ১ মাস ১ মাস করে parallel করে সময় বাঁচাতে পারবেন না।

রেফারেন্স :
https://www.nytimes.com/interactive/2020/science/coronavirus-vaccine-tracker.html
https://www.who.int/publications/m/item/draft-landscape-of-covid-19-candidate-vaccines
https://clinicaltrials.gov/ct2/show/NCT04437875?term=vaccine&cond=covid-19&draw=4
https://tass.com/society/1188313

https://sputnikvaccine.com/about-vaccine/clinical-trials/
https://www.reuters.com/article/us-health-coronavirus-russia-vaccine-spu-idUSKCN2571FV?fbclid=IwAR0n_Cbnif6aLq1xDiyI11DyvpE4I9CAMnvpcmtztaqCon0tWCSet_Cl-aI


Tuesday, July 21, 2020

অক্সফোর্ড আর ক্যানসাইনো - দুই ভ্যাকসিনের গল্প 

এপ্রিল মাসে দেখা সেই ছবিটা মনে আছে? অক্সফোর্ডের গবেষণাগারে তরুণ বিজ্ঞানী ডঃ এলিসা গ্রান্টও-কে  পরীক্ষামূলক টিকা দেবার সেই ফটো ? সেদিন সবার মুখে  এলিসার প্রশংসা। তবে তিনি প্রথম হলেও একা ছিলেন না; গতকাল এলিসা ও আরো ১০০০র বেশি ভলান্টিয়ারের সাহায্য নিয়ে করা গবেষণার ফল প্রকাশিত হল । 

  • Astrazeneca কোম্পানির সঙ্গে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়'র উদোগ্যে তৈরী কোরোনাভাইরাস-বিরোধী ChAdOx1 nCoV-2019 ভ্যাকসিন  বেশ কিছুটা সাফল্য পেল।তাঁদের phase 1/2 পরীক্ষা সফল -   বিখ্যাত আন্তর্জাতিক জার্নাল ল্যানসেটে বিজ্ঞানীরা এমনই জানিয়েছেন। 
অক্সফোর্ড টিকার গবেষণাপত্রের প্রথম পাতার স্ক্রিনশট 
  • পশ্চিম জগতের বেশি প্রচার এবং আমাদের স্বাভাবিক সাহেব-প্রীতি'র জন্যেই সম্ভবত অক্সফোর্ড টিকা নিয়ে এত বেশি কথাবার্তা হচ্ছে মিডিয়ায়। কিন্তু পাবলিক কি খাবে আর কি না খেতে পারে, trp বাড়বে কি বাড়বে না তা নিয়ে তো বিজ্ঞান চলে না।তাই একই দিনে একই জার্নালে প্রকাশিত একই ধরনের আরেকটি গবেষণাপত্রের কথা বলতেই হয়।  চীনা কোম্পানি Cansino Biologics এবং চীনের একাডেমি অফ মিলিটারি সায়েন্স র উদোগ্যে তৈরী পরীক্ষামূলক ভ্যাকসিনের phase 2র কাজ হয়েছে  উহান প্রদেশে ; তার সাফল্যের কথা ও জানা গেল।
ক্যানসাইনো টিকার গবেষণাপত্রের প্রথম পাতার স্ক্রিনশট
  • দুই গবেষণার মূল লক্ষ্য দুটি - এক, পরীক্ষামূলক টিকা কি শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নতুন কোরোনাভাইরাসকে আক্রমণ করতে সাহায্য করছে? দুই, টিকা ইনজেক্ট করার পরে কোন গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে কি? 
টিকা কি দিয়ে তৈরী?
  •  সাধারণত, টিকা তৈরী হয় নির্জীব জীবাণু বা জীবাণুর কোন বিশেষ প্রোটিন দিয়ে। আজ অবধি বাজারে আসা সব টিকা তাই হয়ে এসেছে। মলিকিউলার বায়োলজির যুগে সেই প্রচলিত চিন্তা ভাবনা কিছুটা পাল্টে গেছে। অক্সফোর্ড ও ক্যানসাইনো দুই  টিকা এডিনোভাইরাস নামের একটি ভাইরাস দিয়ে তৈরী। এই বিশেষ এডিনোভাইরাস আদতে শিম্পাঞ্জিদের দেহে অসুখ করায়। কিন্তু, টিকা বানাতে বিজ্ঞানীরা এই এডিনোভাইরাসের নিজস্ব কিছু জীন ছেঁটে ফেলেছেন আর ওর মধ্যে কোরোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের জীন ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ফলস্বরূপ, এ আর আমাদের শরীরে ঢুকে নিজের বংশ বৃদ্ধি করতে পারবে না, কিন্তু স্পাইক প্রোটিন তৈরী করতে পারবে। কি লাভ? ওই স্পাইক প্রোটিনকে চিনে রাখবে আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা। আসল ভাইরাস যদি কোনোদিন ঢোকে তখন জটায়ুর ভাষায়, 'ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই'! তবে বললেই তো হবে না।  টেস্ট করতে হবে।
কি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হল ? 
  •  অক্সফোর্ডে প্রথমে রিসাস বাঁদরদের ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে ভাল আন্টিবডি তৈরী হচ্ছে। তাই এবার মানুষ। এপ্রিল আর মে  মাসে লন্ডন, অক্সফোর্ড, সাদামটন, ব্রিস্টল আর ওয়েস্টন এই পাঁচ শহরের হসপিটালে সব মিলিয়ে ১০৭৭ স্বেচ্ছাসেবকের ওপরে পরীক্ষা করা হয়েছে। এঁদের বয়েস ১৮ থেকে ৫৫র মধ্যে (গড় বয়েস ৩৫), নারী পুরুষ ৫০: ৫০ এবং প্রায় সবাই শেতাঙ্গ। 
  • ৫৪৩জনকে এই নতুন ভ্যাকসিন ইনজেক্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে আবার প্রথম ইনজেকশন দেবার ২৮দিন পরে ওই ৫৪৩র মধ্যে থেকে বাছাই ১০জনকে একটা বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।  
  • আর অন্য  ৫৩৪জনকে একটি পুরোনো মেনিনজকক্কাস ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় এই দ্বিতীয় দলকে (৫৩৪) বলে 'কন্ট্রোল গ্রূপ' . নতুন ভ্যাকসিনের প্রভাব ঠিক কি কি সেটা বুঝতে এই কন্ট্রোল গ্রূপ অত্যন্ত গুরুত্তপূর্ণ। 
  • পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ক্যানসাইনো'র বিজ্ঞানীরা মার্চ মাসে অল্প সংখ্যক লোকের ওপর প্রথম পর্যায়ের টেস্ট করেছিলেন। ফলাফল সন্তোষজনক হওয়াতে এবার  ৫০০র ওপর সুস্থ ভলান্টিয়ারকে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। এঁরা সবাই চীনা, উহান প্রদেশের বাসিন্দা, বয়েস ১৮র ওপরে এবং আগে এঁদের কারুর করোনা ইনফেকশন হয়নি।    
  • ভলান্টিয়ারদের তিন ভাগে ভাগ করে ২৫৩জনকে কম ডোজের টিকা, ১২৯জনকে বেশি ডোজের টিকা এবং ১২৬জনকে প্লাসিবো (এমন এক সলুশন যাতে নির্জীব ভাইরাস ছাড়া টিকার সব উপাদান আছে ) দেওয়া হয়।  
  • দুই ক্ষেত্রেই ১৪, ২৮ ও অন্যান্য দিনের মাথায় পরীক্ষা করা হয় শরীরে এন্টিবডি কেমন তৈরী হচ্ছে আর T cell activation হল কি না।  কোন সাইড এফেক্ট হল কি না তাও নজরে রাখা হয়।
ফলাফল - ১ : পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে ? 
  • দুক্ষেত্রেই দেখা গেছে ভ্যাকসিন দেবার পরে কারুর কোন গুরুতর বাজে সাইড এফেক্ট নেই।অক্সফোর্ড জানিয়েছে যে অনেকেরই গা-হাত-পা ব্যাথা হয়েছে, গা ম্যাজম্যাজ করেছে, জ্বর-জ্বর লেগেছে, মাথা ধরেছে , কিন্তু আর তেমন কিছুই না, আর সে সব প্যারাসিটামল দিলেই সেরে যায়। ক্যানসাইনো'র গবেষণা জানিয়েছে যে গা ব্যথা ছাড়া বেশি ডোজ টিকা দেওয়া কিছু ভলান্টিয়ারের  জ্বর এসেছিল, তবে তা ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়।  
ফলাফল - ২ : ভ্যাকসিন কি কাজ করছে ? 
  • টিকা দেবার পরে ELISA ও অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়েছে কোরোনাভাইরাস-বিরোধী এন্টিবডি তৈরী হল কি না।  এবং আনন্দের কথা, দেখা গেছে সবারই ভাল এন্টিবডি তৈরী হচ্ছে। যাঁরা একবার ইনজেকশন পেয়েছিলেন তাঁদের শরীরে ভাল পরিমান এন্টিবডি তৈরী হয়েছে।আর যাঁরা বুস্টার পেয়েছিলেন তাঁদের ৫ গুন্ বেশি এন্টিবডি তৈরী হয়েছে। এই সাফল্য অনসীকার্য। 
  • দুই গবেষণাই অন্য একটি রেসাল্ট'র দিকে দৃষ্টিপাত করতে চেয়েছে। এন্টিবডি জিনিসটার গুরুত্ব অনেকেই জানেন, কিন্তু রোগ প্রতিরোধে এন্টিবডির দোসর T cellর কথা ডাক্তারি ও বৈজ্ঞানিক মহলেই সীমাবদ্ধ। অথচ, এন্টিবডি তৈরী আর T cell activation হল আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার বাঁয়া-ডায়া ; আর যে কোন ভাইরাসকে পরাস্ত করতে তো T cell বিশেষ প্রয়োজনীয়।বেশি ডিটেলে যাব না, কিন্তু T cell -বিহীন রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা হল অনেকটা ড্রাইভার-ছাড়া গাড়ি (এইডস রোগে এই T cell  ধ্বংস হয় , আর ফল কি নিশ্চয়ই সবাই জানেন). 
  • ELISPOT assay (কিছুটা ELISAর মত পরীক্ষা, কিন্তু তফাৎ আছে) করে ইংরেজ ও চীনা দুই গবেষক দল জানিয়েছেন যে এই নতুন ভ্যাকসিন T cellদেরও চাঙ্গা করে তুলছে।  এটা একটা বড় খবর এবং এই গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য বললে ভুল হবে না।  

  • ব্যাস ! মোটামুটি এই আর কি। অক্সফোর্ড দল নিজেরাই জানিয়েছেন যে ১০০০ জন সাদা চামড়ার ব্রিটিশ তো পরীক্ষার জন্যে যথেষ্ট নয়।  আরো অনেক অনেক লোকের ওপর - বয়স্ক, কিছু অসুখ আগে থেকেই আছে , নানা দেশের নানা গোষ্ঠীর মানুষের ওপর এই সব পরীক্ষা আরো চলবে। সেই জন্যে এর মধ্যেই ইংল্যান্ড তো বটেই, ব্রাজিল আর দক্ষিণ আফ্রিকায় - দুটি দেশেই ভয়ানক মহামারী চলছে - কাজ শুরু হয়ে গেছে। আর  প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর ঠিকঠাক হলে তখন বাচ্ছাদের ওপর টেস্ট করতে হবে।  
  • ক্যানসাইনো ও জানাচ্ছেন যে শুধু চীনা লোকের ওপর পরীক্ষা যথেষ্ট নয়। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর পরীক্ষা প্রয়োজন এবং সেটা দীর্ঘকালীন হলেই তবে লঙ টার্ম ইমিউনিটি হল কি না , এবং অন্য কোন উপসর্গ দেখা দিল কি না বোঝা সম্ভব। সেই সব নিয়ে কিছুটা অগ্রগতি হলে তবেই বাচ্ছাদের ওপরে পরীক্ষা হবে।  
  • শুধু তাই না, ক্যানসাইনো'র বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে যদি কোন মানুষের আগে কোন এডিনোভাইরাস সংক্রমণ হয়ে থাকে তাহলে তাদের শরীরে এই ভ্যাকসিন কিছুটা কম শক্তিশালী। এন্টিবডি তৈরী হয়, কিন্তু এডিনোভাইরাস সংক্রমণ কোনোদিন হয়নি এমন লোকের থেকে কিছুটা কম।  এই ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ কারন এডিনোভাইরাস সংক্রমণ আমাদের সবারই কম বেশি হয় (প্রচুর এডিনোভাইরাস আছে আকাশে বাতাসে - জ্বর গলা ব্যাথা বা খুশখুশ, পেট খারাপ কত অসুখ নানা এডিনোভাইরাস থেকে হয়, নতুন কিছু না।  সম্ভবত সেই জন্যেই আমাদের শরীর আগে থেকেই এডিনোভাইরাসকে চিনে রেখেছে, এবং এবার এই টিকা দিতে তাকে বন্ধু-নয়-শত্রু ভেবে কিছুটা নিকেশ করে দিয়েছে। এই same-side goal ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের দেখতে হবে।  
ভ্যাকসিন কবে? 
  • নিজেদের ধান্দায় আসি - ভ্যাকসিন কবে পাব? এ বছরের শেষে হয়ত কিছু অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তৈরী হয়ে ডাক্তার, স্বাস্থ কর্মী এঁদের দেওয়া হবে।তবে, সবার জন্যে আসতে আসতে সামনের বছর। পুনের সেরাম ইনস্টিটিউট অক্সফোর্ডের ভারতীয় পার্টনার। এর মধ্যেই কাজ শুরু করেছেন।ক্যানসাইনো'র টিকা সম্ভবত তাই করবে, তবে চীনা সেনাবাহিনী এই ভ্যাক্সিনকে 'বিশেষ প্রয়োজনীয় ওষুধ' নাম দিয়েছে, এবং হয়ত এ বছরেই চীনা সৈন্যদের ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হবে। 
  • এছাড়া,  ব্যবসারও তো ব্যাপার। আজকেই যেমন Astrazeneca আর Modernaর শেয়ার উঠল- নামল। 
  • মনে রাখা আবশ্যক, এখনো কিন্তু কেউ এই সব টিকা দেওয়া ভলান্টিয়ারদের শরীরে আসল কোরোনাভাইরাস দিয়ে দেখেননি আসল রোগ প্রতিরোধ হয় কি না।  সেটা বেশ আলাদা ধরণের challenger পরীক্ষা এবং করা নিয়ে অনেক আইনত এবং নীতিগত বাধা আছে।  দেখা যাক কি হয়।  কিন্তু সময় তো লাগবেই।  বিজ্ঞান তো ম্যাজিকও নয়, তুকতাকও নয়; হড়বড় করলে হিতে বিপরীত হবে ।  
=============== ================== =================== ============

টিকা তো আজ না হয় কাল না হয় সামনের বছর আসবে।  ১০০% না হোক, ভালোই কাজ করবে বলে বিশ্বাস। তবে এখন সবাইকে ভাল করে মাস্ক পড়তেই হবে।  ভাল করে জামা প্যান্ট কাপড় টি শার্ট পড়ে বাড়ি থেকে বেরোন তো? তাহলে ঠিক করে মাস্ক পড়তে অসুবিধে কোথায়? 
মাস্ক প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি - বিখ্যাত খবরের কাগজ নিউ ইয়র্ক টাইমস একটি প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট দিয়েছে।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে'র  মিসৌরী রাজ্যের স্প্রিংফিল্ড শহরে মে মাসে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম ছিল।  তাই , একটি সেলুনে কর্মরত দুই মহিলা হেয়ারড্রেসার ভেবেছিলেন যে তাঁদের যে হালকা কাশি আর জ্বর হয়েছে সেটা season changeর  আলার্জি থেকে।তাই দুজনেই টেস্ট করতে দিয়েছিলেন কিন্তু কাজেও যাচ্ছিলেন। দুদিন পরে যখন রিপোর্ট এল যে covid পসিটিভ দুজনেই বাড়িতে স্বেচ্ছাবন্দি হলেন, কিন্তু ততদিনে সেলুনে আসা  ১৩৯ জন খদ্দের ও ৪ জন সহকর্মী'র সঙ্গে তারা ভাল সময় কাটিয়েছেন !!! আতঙ্কিত স্প্রিংফিল্ড পৌরসভা টেস্ট করতে আরম্ভ করে এবং সবাই অবাক হয়ে দেখেন যে ওই ~১৪০ লোকজনের একজনও আক্রান্ত হননি!! এই দুর্দান্ত সাফল্যের পেছনে একটাই জিনিস আছে - মাস্ক।  দুই মহিলা, এবং ওই সেলুনে আসা সবাই, নিয়ম মেনে ভাল করে ভাল মাস্ক বেঁধেছিলেন।  করোনা ঠেকাতে মাস্ক যে কি প্রয়োজনীয় এই ঘটনা তার বড় প্রমান।  শিক্ষণীয়।  
======================================== =============================


============================= ======================


https://www.thelancet.com/journals/lancet/article/PIIS0140-6736(20)31605-6/fulltext

https://www.bbc.com/news/uk-53469839?fbclid=IwAR3IhSimn-C70kQdkPrvOrpWRnJDwaPqBlFRdegEqp6zBLwA8H7HwnM97ss

https://journosdiary.com/2020/07/20/oxford-coronavirus-vaccine-safe-immunogenic-preliminary-phase1-phase2-trial/?fbclid=IwAR0ZqGVL-SVxs-LHTqJH8bTbI2PrL-tLH_No6AnQR7CfbYM0D4hxt55sLLo

https://journosdiary.com/2020/07/20/phase-2-trial-adenovirus-covid-19-vaccine-ad5-ncov-found-safe-immunogenic/?fbclid=IwAR2whEUJFrLNARx-igPQg0cUjwlGpcIjop8a36FxnkUBleWN_lIBI_CDjnE

https://www.livemint.com/news/world/cansino-coronavirus-vaccine-shows-immune-response-in-human-trial-11595290017877.html

https://www.oxfordstudent.com/2020/05/05/exclusive-100-alive-dr-elisa-granato-first-vaccine-recipient-shares-her-experience/

Thursday, July 16, 2020


করোনা বিজ্ঞানের খুচরো খবর -  ১২
Modernaর ভ্যাকসিন, স্যানিটাইজার 'গন্ডগোল', ইত্যাদি 


১. মার্কিন কোম্পানি Modernaর করোনা-বিরোধী টিকা'র প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা ( Phase 1 trial) সফল হয়েছে। বিখ্যাত গবেষণা পত্রিকা নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে বিজ্ঞানীরা এই কথা জানিয়েছেন।  মে মাসে এই সংস্থা একদম প্রাথমিক সাফল্যের কথা জানিয়েছিল। এবার জানা গেল যে Phase 1 গবেষণায়  ৪৫ জন সুস্থ ভলান্টিয়ারকে দু'বার পরীক্ষামূলক টিকা ইনজেক্ট করা হয়। ফলাফল যাতে ভালভাবে বিশ্লেষণ করা যায় সেই জন্যে টিকার পরিমাণেও তফাৎ রাখা হয়েছিল।  প্রথমবার ভ্যাকসিন দেবার ২৮ দিন পরে দ্বিতীয়বার দেওয়া হয় এবং এখনো পর্যন্ত প্রায় দুমাস ধরে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে ভলান্টিয়ারদের রক্তে কোরোনাভাইরাস-বিরোধী এন্টিবডি ভালো তৈরী হয়েছে। এও উল্লেখযোগ্য যে হালকা মাথাব্যথা, গা- ম্যাজম্যাজ, ক্লান্তি ছাড়া আর কোন বড় সাইড এফেক্ট দেখা যায়নি, এবং তাই বিজ্ঞানীরা এবার পরের পর্যায়ে আরো অনেক লোকের ওপরে টিকা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন।

সাধারণত ভ্যাকসিন তৈরী হয় জীবাণুকে নির্জীব করে বা তার কোন একটি প্রোটিনকে পরিশোধিত করে। আজ অবধি যত টিকা আছে সবই মোটামুটি এইভাবে তৈরী। তবে , বায়োটেকনোলজির যুগে Moderna এই ভ্যাকসিন নতুন প্রযুক্তি দিয়ে তৈরী হয়েছে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে RNA ভ্যাকসিন।

স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে আমরা পড়েছি যে আমাদের সবার কোষের নিউক্লিয়াসে যে ক্রোমোসোম আছে তা DNA দিয়ে তৈরী এবং তার ওপর পরপর সাজানো আছে আমাদের জিনগুলি (genes)।  এক একটি জীন আমাদের শরীরের এক একটি প্রোটিন তৈরির নির্দেশাবলী বা code বহন করে। যখন যে প্রোটিন'র দরকার পড়ে সেই জীন তখন active হয়ে ওঠে, সেই জীন'র DNA কপি করে তৈরী হয় একটা RNA আর সেই RNA ব্যবহার করে কোষ সেই প্রোটিনটি তৈরী করে। আজ হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা জানে যে মলিকিউলার বায়োলজির পরিভাষায় DNA-থেকে-RNA-থেকে-protein পথ'র নাম Central Dogma of Molecular Biology. এই হল পৃথিবীর সব প্রাণীর সব কোষের অন্যতম বড় কাজ।

Modernaর ভ্যাকসিনে নির্জীব করা কোরোনাভাইরাস নেই, করোনার কোন প্রোটিন নেই। কি আছে? করোনার স্পাইক প্রোটিন ( ছবিতে গোলাকার ভাইরাস থেকে পায়ের মত বেরিয়ে থাকে দেখেছেন নিশ্চয়ই ) তৈরী করার জন্যে নির্দিষ্ট RNA আছে।  এই RNAকে ইঞ্জেক্ট করে দেওয়া হয়েছে মানব দেহে। শরীরের কোষে ঢুকে পড়লে এই ভাইরাল RNA থেকে  তৈরী হয় স্পাইক প্রোটিন, এবং সেই স্পাইক প্রোটিনকে চিনে রাখে আমাদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা (immune system )।  প্রোটিন বানাবার কাজ শরীরকে আউটসোর্স করে দেওয়া হয়েছে বলতে পারেন।  শরীর নিজেই ভাইরাল প্রোটিন বানাবে আর বানানো হয়ে গেলে শরীরই তাকে চিনে রাখবে।  আশা করা যায় যে আসল ভাইরাস যদি কোনোদিন ঢোকে তাকে এবার দ্রুত চেনা যাবে এবং বধ করা যাবে - ঠিক অন্য টীকায় যেমন হয়।


RNA ভ্যাকসিন তৈরী করা সোজা এবং এর জন্যে আলাদা করে জীবাণু বা তার প্রোটিন বানাতে হয় না বলে বিজ্ঞানীদের আশা  ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন তৈরীর কাজ আরো দ্রুত হবে। অবশ্য, এ একদম নতুন টেকনোলজি ; আগে কখনো ব্যবহৃত হয়নি।  তাই ভাল রকম পরীক্ষা করা হচ্ছে। সামনে বছরের গোড়ায় বাজারে টিকা ছাড়তে পারবে বলে Moderna জানিয়েছে (দাম কত করবে ?? জানি না!) ; ব্যবসা ও বিজ্ঞানের সাফল্য দুই লক্ষ্য থাকলেও ফালতু লোক-দেখানো তাড়াহুড়োর কোন জায়গা নেই। 

আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন 'প্রতিযোগিতায়' অবশ্য এখনো এগিয়ে চীনের কোম্পানি CanSino Biologics. চীনের একাডেমি অফ মিলিটারি মেডিক্যাল সায়েন্সর সঙ্গে একযোগে তাঁদের ভ্যাকসিন phase II পর্যায়ে পেরিয়ে গেছে। প্রজেক্টের সাফল্য দেখে চীনা সেনাবাহিনী একে 'জরুরি ওষুধ' বলে অভিহিত করেছেন এবং সম্ভবত এ বছরের শেষে চীনের সৈন্যরা এই টিকা ব্যবহার করতে পারবেন।

https://www.nejm.org/doi/full/10.1056/NEJMoa2022483?fbclid=IwAR1hGII8NpMaWWS1JuCtGbbUYtNC18WC7A6IeKJm6nnA_UJBo-luO_ID9lM
--------------- ----------------------------------------- -----------------

২. বাজারে আসা অনেক স্যানিটাইজার যে ভাল নয়, বরং ক্ষতিকারক হতে পারে এ কথা পঞ্জাবের Food and Drug Administration দপ্তর জানিয়েছে। Caravan পত্রিকা জানাচ্ছে যে জুলাই মাসের গোড়ায় প্রকাশিত  রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ৬৩টি স্যানিটাইজার পরীক্ষা করা হয়েছিল।  তার মধ্যে ৩৬টি জীবাণু মারতে কার্যকর হবে না, এবং ৪টিতে বিষাক্ত মিথানল পাওয়া গেছে!

এতে খুব একটা অবাক হবার কিছু নেই।  প্রচুর স্যানিটাইজারে বাজার ছেয়ে গেছে সবাই দেখতে পারছেন। আমাদের দেশে যে সব কিছুর কোয়ালিটি কন্ট্রোল হবে না সেটা বলে দিতে হয় না।  আর যে দেশে বিষাক্ত মদ খেয়ে প্রতি বছর বহু মানুষ প্রাণ হারান সে দেশে কেউ কেউ সানিটাইজারে ইথানলের জায়গায় মিথানল মেশাবেন তাতে খুব অবাক হবার কিছু আছে কি? তাহলে উপায়? ভাল কোম্পানির স্যানিটাইজার দেখে শুনে কিনবেন। আর তাছাড়া,  সাবান দিয়ে হাত ধোয়া তো সবচেয়ে ভাল।আজ অবধি এমন  কোন স্যানিটাইজার বেরোয়নি যা কষ কষ করে সাবান জল দিয়ে হাত ধোয়ার থেকে ভাল।

https://caravanmagazine.in/health/with-no-government-oversight-profiteering-industries-flood-indian-markets-with-toxic-sanitisers
 ------------------------------------- -----------------------------------------

৩. একটা ছোট্ট কথা বলে শেষ করি।সবাই তো ভ্যাকসিন ওষুধ ভেন্টিলেটর নিয়ে ভেবে ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছেন না।
কিন্তু, এ প্রসঙ্গে শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের গোড়ার একটা কথা মনে করিয়ে দিই।

শরীরে জীবাণু ঢুকলে তাকে মারতে কোষদের (যেমন রক্তের শ্বেতকণিকা) কি লাগে? এনার্জি।
জীবাণুর বিরুদ্ধে আন্টিবডি তৈরী করতে কি লাগে? এনার্জি।
টিকা নিলে যাতে সেটা জীবাণুকে ঠিকঠাক চিনতে সাহায্য করে তার জন্যে কি লাগে? এনার্জি।
ওষুধ শরীরে ঢুকলে তাকে ঠিকঠাক কোষে পৌঁছে দিতে এবং অনেক সময় সেই ওষুধকে active করতে কি লাগে? এনার্জি। ... ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই এনার্জি শরীর পায় কোথা থেকে? খাবার থেকে। পুষ্টিকর পর্যাপ্ত খাবার।

তাই এত এত ওষুধ/ভ্যাকসিন/ হাসপাতাল বিশেষ কাজে আসবে না একটি জিনিস কমতি পড়লে-  পুষ্টিকর পর্যাপ্ত খাবার।মনে রাখতেই হবে, টিকা বা ওষুধ শরীরকে সাহায্য করে জীবাণুকে পরাস্ত করতে, কিন্তু আসল লড়াই লড়ে শরীর নিজে। শরীর নিজেই সৈন্য, টিকা বা ওষুধ তার হাতের হাতিয়ার। শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা'র  মুলে হচ্ছে পর্যাপ্ত পরিমানে কার্বোহাইড্রেট + প্রোটিন + ফ্যাট + ভিটামিন + জল + ইত্যাদি নিয়ে খাওয়া। ওই জ্বালানি না পেলে ইঞ্জিন চলবে না। তাই আজ কোটি কোটি ভারতবাসী  যদি আধপেটা খেয়ে থাকেন তাহলে রোগ অনেক দ্রুত ছড়াবে। দুর্বল, অভুক্ত শরীরে অনেক সহজেই বাসা বাঁধে ভাইরাস, ছড়িয়েও পড়ে।

ভাল থাকবেন। সাবধানে থাকবেন কিন্তু আতঙ্কিত হবেন না, তাতে কোন এক্সট্রা লাভ নেই ।
মাস্ক ভাল করে পরবেন।  

Tuesday, July 14, 2020

RUSSIAN VACCINE? REALLY? HOLD ON

There is no Russian vaccine as yet. The Gam-Covid-Vac Lyo vaccine being developed by Moscow's Gamaleya Research Institute  has completed only phase 1 trials.

The detailed report from WHO's 'draft landscape of covid-19 candidate vaccines clearly states - 'An open two stage non-randomized Phase 1 study with the participation of healthy volunteers. This clinical trial is an open study of safety, tolerability and immunogenicity of the drug "Gam-COVID-Vac ", ly solution for intramuscular administration, with the participation of healthy volunteers.'


And that is identical to the vaccine update by noted columnist Carl Zimmer in NYT.

Also, the completion dates are clearly written - 5th august and 15th august. (btw, there is a mention of phase 2 there, so its not impossible the 1st and 2nd phases will be combined....thatz ok. nothing unusual, in fact most vaccine porjects are fusing phases 1 and 2 today)

To conclude, a good part of the first phase of experiments have been completed. The next stages start sometime next month. 

How did this go viral? First, a too-brief-and-messy report in Sputnik News, then the picking and shitty exaggeration of it by several media portals and opps! there you have another example of the  Infodemic! Thanks to some news reports which, a day later, reported correctly.


Monday, July 13, 2020

সত্যিই কি রাশিয়ায় ভ্যাকসিন তৈরী হয়েছে ?


এক একটা খবর এমন দুম করে আসে যে এই হাজারটা ব্রেকিং নিউজের যুগেও পিলে চমকে যায়. যেমন, পরশু দিন হঠাৎ বাংলা হিন্দি ইংরিজি সব চ্যানেল, ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ  ইন্টারনেট পোর্টাল সবাই বলতে আরম্ভ করল যে রাশিয়ায় নাকি কোরোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা তৈরী হয়ে গেছে। গত দুদিনে বেশ কয়েকজন আমায় এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস ও করেছেন।

খবর-টা আপাত আনন্দদায়ক হলেও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে অবিশ্বাস্য। একটা টিকা তৈরীর সময় অনেক সাবধানে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়, এবং সেগুলি অন্তত ৩টি Phase (পর্যায় ) ভাগ করা থাকে। এবং অত্যন্ত ফাস্ট ট্র্যাক করলেও সেগুলোর বেশ কিছুটা সময় লাগবেই।সোজা করে ভাবুন না - একটা নতুন ভাইরাস। মাত্র ৬ মাস আগে তার অস্তিত্বর কথা আমরা জেনেছি। প্রথমে বিজ্ঞানীরা তাকে স্টাডি করবেন নানা ভাবে, তারপর ঠিক করবেন কিভাবে ভ্যাকসিন তৈরী করলে ফল পাওয়া যাবে, তারপর সেই মালমশলা তৈরী হবে, তারপর ইঁদুর বাঁদরদের ওপর পরীক্ষা হবে ; তারপর কম সংখ্যক স্বেচ্ছা সেবকদের ওপর টেস্ট হবে দেখা হবে ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, কোন সাইড এফেক্ট বা এলার্জি হচ্ছে কি না; তারপর আরো অনেক মানুষের ওপর টেস্ট করা হবে , সেই সব ফলাফল আসবে সেগুলো বিশ্লেষণ হবে - 'উঠলো বাই ভ্যাকসিন চাই' করলেই হয় না কি ? মামার বাড়ির আবদার?

আর সেই জন্যেই গত সপ্তাহে যখন খবর আসে যে হায়দারাবাদের ভারত বায়োটেক কোম্পানি না কি ১৫ই অগস্টের মধ্যে বাজারে টিকা আনতে যাচ্ছে, তখন সারা দেশের বিজ্ঞানী আর ডাক্তার মহল চিন্তায় পরে গিয়েছিলেন। অনেকে প্রতিবাদও করেছেন, ইন্ডিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্স লিখিত আপত্তি জানিয়েছে। আর তাই এবার যখন মিডিয়ায় যখন হুট্ করে রাশিয়ার ভ্যাকসিনের কথা এল সবাই আরো চমকে গেলেন।

আরো কারণ ছিল।  WHO র নিজস্ব লিস্ট আছে যাতে দেখা যায় এখন পৃথিবীর নানা গবেষণাগারে যে ১৪৫টির বেশি করোনা ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চলছে সেগুলি পরীক্ষার কোন পর্যায়ে আছে।  এসব তো আর গোপন খবর নয়, বিজ্ঞানীরা এসব জনসমক্ষেই রাখেন। আর সেই লিস্টেই আছে যে মস্কোর গামালেয়া রিসার্চ ইন্সিটিটিউট যে Gam-COVID-Vac ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছেন সেটি phase 1এ আছে।


 তাছাড়া বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক কার্ল জিমার ভ্যাকসিন গবেষণা নিয়ে প্রায়ই নতুন খবর update দিচ্ছেন এবং এক সপ্তাহ আগে তিনিও একই খবর দিয়েছিলে - গামালেয়ার টিকা প্রথম পর্যায়'র কাজ জুন মাসে শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক প্রশ্ন - হঠাৎ কি করে ভ্যাকসিন তৈরী হয়ে গেল??? কিছু একটা দাবি করলেই হল??

অনেকেই এ নিয়ে সন্দেহ করেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় মজা করেছেন। কিন্তু, একটু তলিয়ে দেখলেই দেখা যেত যে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা 'ভ্যাকসিন তৈরী' এমন কোন দাবিই করেননি। কেন করবেন? তাঁদের কি ভীমরতি হয়েছে? পলিটিক্সকে দুমদাম বলে ছাড় পাওয়া যায় (আজকাল বেশিই যায় হয়ত), কিন্তু বিজ্ঞানে যায় না।

তাহলে? আর কি - ভুল রিপোর্টিং! সম্ভবত trpর দৌড়ে ভেরিফাই না করে হড়বড় করে খবর পরিবেশন করতে গেলে যা হয়।

তাহলে ঠিক খবর কি?
 রাশিয়ার ইনস্টিটিউট জানিয়েছে যে তাঁদের phase 1র বেশ গবেষণা শেষ হয়েছে। ৩৮ জন ভলান্টিয়ারের ওপর পরীক্ষামূলক টিকা প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং ফলাফল সন্তোষজনক। মূল কথা হচ্ছে phase 1. ওদের রিপোর্ট স্পষ্ট জানাচ্ছে এই পর্যায় ছিল  An open two stage non-randomized Phase 1 study with the participation of healthy volunteers. This clinical trial is an open study of safety, tolerability and immunogenicity of the drug "Gam-COVID-Vac ", ly solution for intramuscular administration, with the participation of healthy volunteers.


শুধু তাই নয়, রিপোর্ট এও পরিষ্কার বলছে যে পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ১৮ই জুন (সেটা সব খবর ঠিক বলেছে ) , আর এই পর্যায়ের সব ফলাফল বের করতে ৫ই বা ১৫ই অগস্ট অবধি লাগবে। 


অবশ্য ওই রিপোর্টে এক জায়গায় phase 1 আর phase 2 কথাদুটি পাশাপাশি আছে।  সেটার মানে ঠিক বলতে পারব না, তবে অনেক ক্ষেত্রেই দুটো phaseকে সময় বাঁচাতে জুড়ে দেওয়া হয়।  নতুন কিছু না, বিশেষত করোনা ঠেকাতে প্রায় সবাই এটা করছেন। মনে হয়,  এঁরাও ফলাফল পর্যালোচনা করে সেটা করতে পারেন। 


এই হল বিজ্ঞানীদের কথা।  মিডিয়ায় এই ভুল রিপোর্ট করল কে? 
সম্ভবত রুশ সংস্থা স্পুটনিক নিউজ যে রিপোর্ট করেছিল তাতে ব্যাপারটা অত স্পষ্ট করে বলা নেই।  বিশেষত তার হেডিং বেশি গন্ডগোলে  - এই যে 'Russia's Sechenov University Successfully Completes Trials of World's 1st COVID-19 Vaccine'. বুঝতেই পারছেন, trials যে শুধু phase 1 trial সেটা না লিখেই গন্ডগোলের সূত্রপাত। 


তবে তার পরে এত এত সাংবাদ সংস্থা কেন একটু ডবল চেক না করে লাফালাফি করলেন কে জানে? কোন মানে হয়?!  অবশ্য, এটাও ঠিক এক-দুদিন দেরি হলেও কয়েকজন সাংবাদিক সঠিক রিপোর্ট করেছেন। তাঁদের ধন্যবাদ। 

যাই হোক, মোদ্দা কথা রুশ বিজ্ঞানীরা শুধু phase ১র প্রাথমিক সাফল্যের কথাই বলেছেন। সেটাই বৈজ্ঞানিক সত্য, বাকি সাব বাকওয়াস হয় । প্রচুর চাপ থাকলেও বেশিরভাগ বিজ্ঞানী আজও বিজ্ঞানের নিয়ম মেনেই চলেন। ভ্যাকসিন আসতে সামনের বছর।  

https://www.who.int/publications/m/item/draft-landscape-of-covid-19-candidate-vaccines

https://clinicaltrials.gov/ct2/show/study/NCT04436471?term=vaccine&cond=covid-19&draw=4

https://clinicaltrials.gov/ct2/show/record/NCT04437875?term=vaccine&cond=covid-19&draw=4

https://sputniknews.com/russia/202007121079860277-russias-sechenov-university-successfully-completes-trials-of-worlds-1st-covid-19-vaccine/

https://www.theweek.in/news/world/2020/07/13/did-russian-covid-19-vaccine-complete-clinical-trials-or-phase-i-trials.html

Monday, June 22, 2020

পশ্চিমবঙ্গের করোনা লড়াই - 
জুন তো শেষ হতে চলল, কি অবস্থা ? 
(করোনা বিজ্ঞানের খুচরো খবর - ১১)


ইংরিজিতে একটা কথা আছে -  the other side of the river is green. সোজা কথায় 'ওদের ওদিকে সব ভাল, আমাদের এদিকে সব খারাপ'। করোনা নিয়েও একই কথা চলছে।  নিজেরাই চিন্তিত হয়ে বলছি 'খুব করোনা ছড়াচ্ছে, কি যে হবে?' আবার যেহেতু যে কোন সমাজের একটা বড় জিনিস হল self-contradiction বা  নিজস্ব-বিরোধিতা ওই হাহুতাশ করার পরমুহূর্তে নিজেরাই অনেকে মাস্ক না পরে বা থুতনি'র কাছে পরে করোনা ছড়াতে 'সাহায্য করছি' ।আবার পরের দিন 'কাগজ বা খবর দেখতে দেখতে হায়-হায়  করছি, 'আজ আরও করোনা ছড়িয়েছে' ।  

করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা যে দেশে ভালোই বেড়ে চলেছে, এবং ভারত যে 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লভের' দিকে দ্রুত এগোচ্ছে সেটাও আমাদের অজানা নয়। তবে সে  সব পরিসংখ্যান নিয়ে বেশ কিছুটা লেখা হয়েছে। এখানে আমরা দেখার চেষ্টা করছি জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এসে আমাদের রাজ্যের কি অবস্থা। কারণ একটাই - তার সঙ্গেই আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ সবচেয়ে বেশি জড়িত।

আসুন, পশ্চিমবঙ্গে covid-১৯ পরিস্থিতি কেমন, উন্নতি হল না অবনতি , সেটা একটু দেখা যাক।  

প্রশ্ন: আমাদের রাজ্যের হাল কি সবচেয়ে খারাপ? 
উত্তর: উত্তর যে 'না' সেটা আমাদের অজানা নয়।  দুর্ভাগ্যবশত, মহারাষ্ট্র, গুজরাট দিল্লী ও চেন্নাইবাসীরা আজ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি বিপদে পড়েছেন সেটা আমরা মোটামুটি জানি।  তাও, যদি মে আর জুন মাসের পরিসংখ্যান গ্রাফ এঁকে দেখাই তাহলে এইরকম দেখাবে।  

নীচে দেখুন।  X-axis হচ্ছে সময় - অর্থাৎ ৪ঠা মে থেকে ১৯শে জুন অবধি 'দিনলিপি'।  আরY-axis হচ্ছে  3-day average for positives/tests % , অর্থাৎ দিনে কত টেস্ট হল আর তার মধ্যে কজনের করোনা ধরা পড়ল তার percentage. এই percentageর ফলাফল দেখতে হবে কারন স্বাভাবিক ভাবে সারা দেশের দৈনিক টেস্ট সংখ্যা এবং আক্রান্ত সংখ্যা এই রাজ্য (বা যে কোন রাজ্যের) তুলনায় অনেক বেশি হবে, সুতরাং তুলনা করার মানে হয় না ।  শুধু তাই না, দিনকে দিন আক্রান্তের সংখ্যা কিরকম বাড়ছে বা কমছে বা একই রকম থাকছে তার একটা ভাল আন্দাজ পাওয়া যায় এইpercentage থেকে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, এখানে তিন দিনের এভারেজ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছি।ধরুন, গ্রাফে প্রথম পয়েন্ট হল ১৬, ১৭, ১৮ই মে'র এভারেজে; দ্বিতীয় পয়েন্ট হল ১৭, ১৮, ১৯ মে'র এভারেজ। এরকম করে চলতে থাকে।  তাতে যে দৈনন্দিন noise কমে যায়, trend বুঝতে সুবিধে হয়।  এই দেখুন গ্রাফ।



ভারতের  positives/tests ratio যে মোটের ওপর বেড়েই চলেছে সে তো পরিষ্কার।  আর পশ্চিমবঙ্গ? যেটা  লক্ষণীয় সেটা হল যে মে মাসের গোড়ার দিকে রাজ্যের এই এভারেজ positives/tests % সমগ্র ভারতের %র মাথায় মাথায় বা অল্প বেশি ছিল !  কিন্তু, তারপর রাজ্য যখন এপ্রিল মাসের 'ল্যাদ খাওয়া' ছেড়ে অনেক বেশি টেস্ট করতে শুরু করে এই %ও উন্নতি করতে থাকে (অর্থাৎ কমতে থাকে) এবং ভারতের ratio বাড়তে থাকলেও মে মাসের মাঝামাঝি এই রাজ্যের % যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছিল দেখাই যাচ্ছে। এর থেকে দুটি ব্যাপার conclude করা যেতে পারে।  এক, পশ্চিমবঙ্গে আগে  মূলত রুগী তাঁর কাছাকাছি যাঁরা আছেন তাদের পরীক্ষা হচ্ছিল। তাই পসিটিভ বেশি ছিল আর ratio বেশি হচ্ছিল । কিন্তু, মে মাস থেকে আক্রান্ত খোঁজার জন্যে টেস্ট আরো বাড়ানো হয় এবং দেখা যায় যে অনেকের জ্বর সর্দি কাশি হলেও তিনি নতুন করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত নন, রেসাল্ট নেগেটিভ আসছে আর ওই % কমতে শুরু করে। আর তাছাড়া,  যত টেস্ট হবে তত আক্রান্ত ধরা পড়বেন তত তাঁদের চিকিৎসা বা কোয়ারেন্টাইন হবে, রোগের ছড়িয়ে পড়া আটকাবে - সোজা হিসেবে। একটু দেরি করে হলেও, রাজ্য যে সেই পথে দেড় মাসের বেশি এগিয়েছে দেখে ভাল লাগল। 
 (এই গ্রাফে আবার ফিরে আসব। দরকার আছে)  

প্রশ্ন: ভারতের positives/tests % কেন বাড়ছিল? 
উত্তর: কারন মহারাষ্ট্র, গুজরাটের, তামিল নাড়ুও দিল্লীর positives/tests % অনেক ওপরের দিকে।  তাই কেরল বা উড়িষ্যা বা পশ্চিমবঙ্গ কমের ওপর থাকলেও জাতীয় positives/tests % অনেক বেড়ে যাচ্ছে।  যেমন এই গ্রাফে ধরা পড়ছে  গুজরাটের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তুলনামূলক বিচার।গুজরাটের positives/tests % যে গত দেড় মাস ধরে অনেক বেশি সেটা তো পরিষ্কার। আমার ধারণা মহারাষ্ট্র বা দিল্লীর পরিসংখ্যান  গ্রাফে দিলে গুজরাটের তুলনায় বেশি তবু কম হবে না।  

 গুজরাটবাসীকে ছোট করে দেখানো আমার লক্ষ্য নয় ;প্রসঙ্গত বলে রাখি, জীবনের  গুরুত্বপূর্ণ দুটি বছর আমি গুজরাটে কাটিয়েছি। বহু বন্ধু গুজরাটি, এবং আজ তাদের জন্যে, তাদের বাবা মা'র জন্যে আমি বেশ চিন্তিত। কিন্তু, বহু প্রচারিত 'গুজরাট মডেল' যে বিপদের দিনে চিকিৎসাক্ষেত্রে কাজের নয় সেটা দেখাই যাচ্ছে।   

প্রশ্ন: গুজরাটের অবস্থা যে খারাপ সে তো আমরা জানি।যে সব রাজ্য covid-১৯কে ভাল ট্যাকেল করেছে বলে খবর আসছে তাদের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা কি? 
উত্তর: কেরলকে ধরছি না - ওঁরা যা করেছেন তা এক কথায় অনন্য, দেখবেন ভবিষ্যতে মেডিকেলের পাঠ্যপুস্তকেও কেরলের রোগ-প্রতিরোধ লড়াই'র স্ট্রাটেজি স্থান পেতে পারে। এক্ষেত্রে উড়িষ্যা ও কর্ণাটক - এমন দুটি রাজ্য যাঁরা কোরোনাভাইরাসকে যথেষ্ঠ ভাল আটকেছেন বলে খবর আছে - তাদের সঙ্গে এই রাজ্যের পরিসংখ্যান পাশাপাশি ফেলে দেখা যাক।আর আছে বিহারের পরিসংখ্যান। বেশি কথায় কাজ নেই, আবার গ্রাফ । 



উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গ যে মোটামুটি একই positives/tests% দিচ্ছে দেখতেই পারছেন।কিন্তু দুই রাজ্যের ট্রেন্ড বা সার্বিক লক্ষণ যে একই সেটা অনস্বীকার্য। জাতীয় গড় %র অনেক তলায়। আর কর্ণাটকের অবস্থা এই দুই রাজ্যের তুলনায় একটু better.  বিহার একসময় খুব বেশি পসিটিভ ধরা পড়ছিল কিন্তু এখন দেখছি কমে কমে উড়িষ্যা আর পশ্চিমবঙ্গের তলায় চলে গিয়ে কর্ণাটকের লাগোয়া। ..... 

মূল আশস্থকর কথা - পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা সব রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ, এটা ভয়ানক  গাঁজা এবং মনে করার কোন তথ্যভিত্তিক কারণ নেই। বরঞ্চ, কেরলের মত না হলেও উড়িষ্যা ও কর্ণাটকের মত covid ঠেকানোয় পারদর্শী রাজ্যের সমগোত্রেই পড়বেন এ রাজ্যের চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মীরা।
আর এসব দেখেও কেউ যদি কেউ বলেন যে এই সব তথ্য ভুল তাহলে প্রথম প্রশ্নই হবে অন্য কোন বিজ্ঞান-ভিত্তিক জাতীয় স্তরে প্রকাশিত পরিসংখ্যান  আপনার হাতে আছে ? তখন কিন্তু ঠিকঠাক উত্তর দিতে হবে।তখন  'ওসব বাজে কথা' 'জানি জানি আমরা জানি' হোয়াটস্যাপ-বাতেলা মারলে চলবে না।  

প্রশ্ন: এমনও তো হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ ওই দুই রাজ্যের তুলনায় কম টেস্ট করছে বলে মনে হচ্ছে ওদের মত অবস্থা।  আসলে অনেক খারাপ? 
উত্তর: না।  এই প্রশ্ন আমার মনেও এসেছিল কিন্তু তারপর পরিসংখ্যান দেখে আমি নিজেই অবাক।  কারণ ১৬ই মে থেকে ১৯শে জুন, এই চৌত্রিশ দিনে (যা ওই গ্রাফের সময়-পরিধি ) 
পশ্চিমবঙ্গে টেস্ট হয়েছে 303,324 (average 8921 tests per day), 
উড়িষ্যায় টেস্ট হয়েছে 130,467 (average 3837 tests per day),
বিহারে টেস্ট হয়েছে 101, 222 (average 2977 test per day)
 গুজরাটে টেস্ট হয়েছে 175,900 (average 5173 tests per day) আর 
কর্নাটকে টেস্ট হয়েছে 344,036 (average 10, 118 tests per day) . 
অর্থাৎ বিহার, উড়িষ্যা ও গুজরাটের থেকে দৈনিক টেস্ট সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গ অনেক এগিয়ে এবং মোটামুটি কর্ণাটকের কাছাকাছি।  

এ বেশ বড় সাফল্য। যে রাজ্য এপ্রিলের শেষে দিনে ১০০০-১২০০ টেস্ট করছিল সেই রাজ্য গত এক মাসের বেশি দৈনিক ৯০০০ মত টেস্ট করেছে (সাইক্লোনের দুদিন বাদ দিলে - তখন ৪০০০-৫০০০ হয়েছিল) এবং গত দুদিনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দশ হাজারের বেশি পরীক্ষা হয়েছে। এর প্রধান কারণ নিশ্চয়ই টেস্ট ল্যাব বাড়ানো।  ৪ঠা মে রাজ্যে টেস্ট করার ল্যাব ছিল ১৬টি, আর আজ ২১শে জুন সেই সংখ্যা হল ৪৯. তিনগুন বৃদ্ধি।  শুধু তাই নয়, খবর পেয়েছি যে প্রতি জেলায় টেস্ট সেন্টার তৈরির কাজ বেশ কিছুটা এগিয়েছে কিংবা টেস্ট শুরু হবার মুখে। অবশ্য,  contact tracing কতদূর হচ্ছে সেটা এইসব তথ্য দেখে বোঝা যাবে না, কিন্তু টেস্ট সংখ্যা এত বাড়ানো তো ভাল বলতেই হবে।  (পার্টিগত রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকলে অন্য ব্যাপার....) 
সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিসংখ্যান অনেকাংশে ওই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে।  না, কম-টেস্ট-তাই-কম-পসিটিভ এই ব্যাপারটা আর সেভাবে এই রাজ্যের ক্ষেত্রে খাটে না. বরং, এখন উল্টে প্রশ্ন করা যেতে পারে বিহার, উড়িষ্যা বা তেলেঙ্গানা কম টেস্ট করছে কেন?  
শুনেছি যে উড়িষ্যার contact ট্রেসিং খুবই ভাল।  হতেই পারে, আর তাছাড়া জনসংখ্যা তেমন বড় না।  তাই কম টেস্ট করে হয়ত চলতেই পারে।  কিন্তু, বিহার ? বিহারের জনসংখ্যা ১১.৯৫ কোটি আর পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা তার থেকে ২.২ কোটি কম।  অথচ, ওঁদের ওখানে টেস্ট হচ্ছে গড়ে পশ্চিমবঙ্গের এক তৃতীয়াংশ । সুতরাং,একটা 'খচখচ' থেকেই যাচ্ছে।

এটা ঠোকার জন্যে বলছি না , বলার মূল কারণ হল বিহার এবং উড়িষ্যা'র সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নিবিড় আর্থসামাজিক যোগাযোগ । এই দুই রাজ্যের বহু নাগরিক কর্মসূত্রে এখানে থাকেন, লকডাউনের সময়ে ফিরে গেছেন এবং এখন আবার ফিরে  আসছেন। তাছাড়া সমগ্র পূর্ব ভারতে বহু পরিযায়ী শ্রমিক ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ভিড় ট্রেনে ফিরেছেন। অগণিত গ্রাম শহর শহরতলি গঞ্জে তাঁরা মিলিত হচ্ছেন। নিজেদের রাজ্যে  টেস্ট পর্যাপ্ত না হলে তাঁরা যখন পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসবেন তখন কিন্তু asymptomatic carrier বেড়ে যাবার আশঙ্কা থাকছে।  এই ব্যাপারে আমাদের রাজ্যকে সর্বস্তরে বৈজ্ঞানিক মতে সতর্ক হতে অনুরোধ করছি। 'ও কিছু হবে না' ভাবার সময় আসতে এখন বহু দেরি।  

অবশ্য, এ কথা স্বীকার করতেই হবে initial dilly-dally কাটিয়ে এই রাজ্য বেশ কিছুটা চেষ্টা করেছে এবং সেই জন্যেই আজ করোনা আক্রান্তদের  মধ্যে মৃতের সংখ্যাও কমেছে।  গোড়ার দিকে যতজন আক্রান্ত হচ্ছিলেন তাঁদের ১০% র বেশি মারা যাচ্ছিলেন! এটি একটি বিশাল সংখ্যা এবং বেশ আতঙ্কের কারণ ছিল। আজ কিন্তু সেই অবস্থা উল্লেখযোগ্য ভাবে বদলেছে।  গ্রাফ দেখুন। মে আর জুন মাসে ভারতের আর পশ্চিমবঙ্গের mortality rate (১০০ জন আক্রান্তের মধ্যে কতজন মারা গেলেন). পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তার ও স্বাস্থ কর্মীদের সাধুবাদ দিতেই হবে।  অনেক অসুবিধের মধ্যে তাঁরা আজ মৃত্যুহার কমাতে অনেকাংশে সফল।  

In fact, গতকাল (২১শে জুনের ) মৃত্যুহার দেখলে বোঝা যাবে আরো উন্নতি করেছে এবং এখন পশ্চিমবঙ্গের mortality rate  (৩.৯৯%). তুলনামূলক ভাবে দেখলে মহারাষ্ট্রে এই হার ৪.৬৭%, মধ্যপ্রদেশে ৪.৩৩%, গুজরাটে ৬.০৯% আর দিল্লীতে ৩.৬৪%.  আবার উল্টোদিকে কর্ণাটক (১.৫%), উড়িষ্যা (০.৩৭%)  সাফল্য উল্লেখযোগ্য।   

পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুহার কেন বেশি ছিল (বা এখনো আছে) সেটা একটা প্রশ্ন বটে।  উত্তর আমার জানা নেই, আর হাতে সেরকম ডিটেল পরিসংখ্যান ও নেই।  তবে লক্ষণীয় যে যে ৫৫৫ মারা গেছেন তাঁদের ৪১৩ (অর্থাৎ ৭৪% ) কলকাতা আর উত্তর ২৪ পরগনার বাসিন্দা - তার মধ্যে সল্টলেক আর রাজারহাট নিউ টাউন অঞ্চল, পড়ছে ।  হাওড়ায় আরো ৭৫ জন। আর কলকাতা, সল্টলেক, রাজারহাট নিউটাউন অঞ্চলের একটা বড় সংখ্যক নাগরিক যে বয়স্ক সেটা তো অজানা নয় - সেই জন্যেই তো অনেকে আজকাল কলকাতাকে 'পুরো শহরটাই তো old age home' বলে থাকেন ; এবং করোনা যে বয়স্কদের পক্ষে (বিশেষত যাদের অন্য কোন অসুখ আছে তাঁদের পক্ষে) বেশি  মারাত্মক সে তো সবাই জানি। সেটাই কি এইসব অঞ্চলে মৃত্যুহার বেশি হবার কারণ? সেই জন্যেই কি পশ্চিমবঙ্গের সার্বিক মৃত্যুহার বেশি? হতে পারে .....

আগের তুলনায় মৃত্যুহার কমেছে কেন? 
আগের ব্লগে যা লিখেছিলাম তাই এখানে আবার তুলে দিচ্ছি - সম্ভবত দুটি কারণ - এক, আগে পরীক্ষা মূলত রুগী (এবং গুরুতর অসুস্থ রুগী) এবং তাঁর কাছাকাছি যাঁরা আছেন তাদের টেস্ট হচ্ছিল; তাই positive to death conversion বেশি ছিল।  এখন সামাজিক লেভেলে টেস্ট বেড়ে যাওয়াতে (এবং যেহেতু এই অসুখের ৮০%র বেশি এমনিতেই সেরে যান, ৯০%র বেশি হাসপাতালের ধারেকাছেও যেতে হয় না - এটা ভুললে চলবে না ) করোনা'য় মৃতের টোটাল সংখ্যা বাড়লেও সেই rate নিম্নগামী। দুই,  তাছাড়া, একটি নতুন অসুখ এলে সেটার গতিপ্রকৃতি বুঝতে কিছুটা সময় তো লাগেই। স্বাভাবিক, এত ম্যাজিক নয় রে বাবা, মছলিবাবাও নয় ! তাই, মনে হয়, অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও রাজ্যের ডাক্তার ও স্বাস্থকর্মীরা এখন এই লড়াইয়ে আরো experienced হয়ে উঠেছেন।করোনা চিকিৎসার জন্যে নিয়োজিত বেড ও বেড়েছে - ৩১শে মে ৮৭৮৫টি বেড ছিল, আর এখন সেই সংখ্যা ১০৩৪০। তাই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত বেড আছে বলেই মনে হয়  (নীচে গ্রাফ দেখুন  - ৮০% মত বেড খালি পাওয়া উচিত; তবে কথা আর কাজে কতটা  ফারাক কি করে বলব ? ). 


প্রথম গ্রাফে ফিরে যাই।  আপনাকে স্ক্রল করতে হবে না , এই যে আবার দিয়ে দিলাম।  
মে মাসের গোড়ায় ratio বেশি ছিল, তারপর ভালোই কমছিল কমছিল কমছিল - ২০শে মে নাগাদ সর্বনিম্ন।  তারপর আবার বাড়তে আরম্ভ করল।  কি হল? আক্রান্ত কমে আবার বাড়তে আরম্ভ করল কেন? মনে করে দেখুন মে মাসের শেষের দিকে ঘটা দুটো কারণ প্রথমেই মনে আসে - এক, পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা। আর দুই, সাইক্লোন উমপুন্।  
দেখুন, ছোটবেলায় একটা খেলা খুব চলত - স্ট্যাচু! যেই বলা হবে অমনি দাঁড়িয়ে পড়তে হবে, নো নড়ন চড়ন ! লোকডাউনও তাই।  যে যেখানে সে সেখান থেকে নড়বে না। এ শহর থেকে ও শহর, এ রাজ্য থেকে ও রাজ্য, এ দেশ থেকে ও দেশ যাতায়াত বন্ধ। বন্ধ মানে বন্ধ। তবে যে দেশের ৮০% লোক মাস গেলে স্টেডি মাইনে পান না তারা তো খালি পেটে বসে থাকতে পারেন না, তাই অভিজিৎ ব্যানার্জি'র উপদেশ ছিল যে সবাইকে পর্যাপ্ত খাবার এবং মাসের খরচ চালাবার টাকা দিতে হবে। 
হল না।  রেশন কিছুটা এলেও টাকা সেভাবে এল না ।  কোন কোন রাজ্য অবশ্য চেষ্টা করেছিলেন নিজের তহবিল খরচ করে শ্রমিকদের যত্ন নেবার।  কিন্তু তারও তো একটা লিমিট আছে।  পশ্চিমবঙ্গ যেমন তার বকেয়া টাকা চাইছে অন্য সবাই ও তো চাইছে - পাচ্ছে না। কত করবে ? - সবারই তো নিজের  রাজ্যবাসীর কথা ভাবতে হবে আগে।  আর তার ওপর রেল-রাজ্য coordinate না হয়েই ভিড় ট্রেন চলতে আরম্ভ করল।কি আর বলবেন ? কথার কথা বলছি, একদিনে হয়তো ২০০০র শ্রমিকের টেস্ট করা যায়, থাকা খাবার ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু ১০০০০র যায় কি?  আপনাকে দায়িত্ব দিলে পারবেন? আমায় দিলে তো কাঁচকলা পারব। 

তার ওপর এল ঝড়। পরিযায়ী শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করতে অবস্থা টাইট, তারপর কয়েক কোটি বাঙালি ঘোর বিপদে পড়লেন।  সব মিলিয়ে যা হল ভাইরাসের যদি বোধবুদ্ধি থাকত তাহলে তো আনন্দে লাফাত,' লটারি পেয়েছি লটারি'!  

আর তাই আবার পরের গ্রাফগুলো দেখি। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কবে থেকে কতটা বাড়ল আক্রান্তদের সংখ্যা।  
একটা গ্রাফে সব জবরজং হয়ে যাবে বলে ৪টি গ্রাফ করেছি। আর কোনো কারণ নেই।  

প্রথম গ্রাফেই কলকাতা, হাওড়া ২৪ পরগনা।  আক্রান্ত মে মাসের গোড়া থেকেই যথেষ্ঠ। সে তো জানি - এপ্রিলেই বেশি ছিল।  

compare করুন উত্তরবঙ্গর সাত জেলা  ও মালদা,  মুর্শিদাবাদ , নদীয়া, বীরভূম, বাঁকুড়ার সঙ্গে।  প্রত্যেকের ক্ষেত্রে আক্রান্তের সংখ্যা ২২ থেকে ২৭র মে'র পরেই বাড়তে আরম্ভ করছে।  

একই কথা প্রযোজ্য মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া , বীরভূম সবার জন্যে।  মে মাসের মাঝামাঝি অবধি নগন্য, ২২-২৭ মে'র পর থেকেই সংখ্যা বাড়ছে।  

ভাল কথা, যে হুগলি ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের অন্য জেলা এখনো যথেষ্ঠ কম।  

নজর করতে ভুলবেন না যে কলকাতা হাওড়া গ্রাফের Y-axis অনেক বেশি।  হাজার-দুহাজার-তিন হাজার।  অন্য জেলাদের ক্ষেত্রে সেটা এখনো ২০০-৩০০-৪০০.

তাহলে সব যোগ করে কি দাঁড়াচ্ছে - কলকাতা হাওড়া গোড়া থেকেই বেশি।  অস্বাভাবিক নয়।  যেখানেই যাতায়াত বেশি, জনসংখ্যার ঘনত্ত বেশি সেখানেই বেশি - যেমন মুম্বই, দিল্লী, আমেদাবাদ, চেন্নাই (ফেব্রুয়ারি মাসে সব এয়ারপোর্ট বন্ধ করে দিলে কি এই দুর্দিন আজ আসে??) .  কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের বহু জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে মে মাসের শেষ থেকে।  এর সঙ্গে পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার যোগাযোগ থাকার ভালোই সম্ভাবনা।  তার মানে ঠিক যখন এই রাজ্য টুকটুক করে হলেও কোরোনাকে একটু বাগে আনছিল, তখনই কেসটা কেঁচে গেল।  আর তাছাড়া, আমার ধারণা, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সংখ্যা আরো বাড়বে আগামী দিনে। উমপুন্ ঝড়ে যে ভয়ঙ্কর ভাবে রাস্তাঘাট-জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার প্রভাব টেস্ট ও চিকিৎসার ওপর পড়তে বাধ্য।  আর তাছাড়া জেলায় জেলায় টেস্টিং সেন্টার পুরোদমে কাজ করতে শুরু করলে সংখ্যা কিছুটা বাড়বে।  স্বাভাবিক। 

প্রসঙ্গত, ওপরের গ্রাফে যেটা নজরে পড়ে সেটা হল উড়িষ্যার %ও কিন্তু মে মাসের শেষে বাড়তে আরম্ভ করেছে।  কারণ সম্ভবত একই - পরিযায়ী শ্রমিক।  বিহার অবশ্য কমেছে। সেটা সাফল্য হতেই পারে।  কিন্তু কি করে? বহু পরিযায়ী শ্রমিক তো বিহারে  ফিরেছেন, তাই না ? এর সঙ্গে কম টেস্টের কোন যোগ আছে কি?  .....টেস্ট সংখ্যা আরো অনেক বেশি হলে নিশ্চিত হওয়া যেত।  

শেষের কথা: 
তবে এসবে তো ভিরমি খাবার কিছু হয়নি। অসুখ যদি হয় ও, নিয়ম মেনে চললে, ৯৫% র বেশির যে সেরে যাবেই সে তো দেখায় যাচ্ছে। বিপদের দিনে বাঙালি হয়ে বাঙালির পাশে না দাঁড়ালে আমরা সবাই এতদিন কি রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-চিত্তরঞ্জন-বিবেকানন্দগিরি করলাম ?  তবে হ্যাঁ, কাজটা আরো অনেক কঠিন হয়ে গেছে।  সে তো গেছেই।  দুম করে ব্যবসাপত্র রোজগার সব তুলে দিয়ে , লক্ষ লক্ষ লোক ভিড় ট্রেন বা কয়েকশো মাইল হাঁটছেন - টোটাল unplanned ভাবে এভাবে ছড়িয়ে লাট না করলে ভারত আজ 'করোনা কাপের' শেষ চারে উঠে যায় ??!! 


পশ্চিমবঙ্গ যে এখনো কমের ওপর আছে সে তো দেখাই যাচ্ছে। কে জানে? হয়তো এত দোষের মধ্যেও আমাদের critical attitude রাজ্যকে কিছুটা সাহায্য করেছে। আশা করছি আহমেদাবাদ মুম্বাই দিল্লী র মত অবস্থা এখানে হবে না - জানি না  ...... তবে একটা কথা বলে শেষ করি।  গতকাল রাত্রে একটা মজার খবর পড়লাম।  গত দু তিন সপ্তাহ আমেরিকায় যে প্রচুর বর্ণবিদ্বেষ আন্দোলন হচ্ছে সবাই পড়েছি।দারুন, হওয়া উচিত। তবে ,অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে  এইসব মার্কিন মিছিল মিটিংয়ে র জন্যে করোনা বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।  কারণ, মিছিল মিটিং মানেই তো ভিড়।  কিন্তু, সর্বশেষ তথ্য দেখে মনে হয় না মিছিল মিটিংয়ের জন্যে নতুন করে রোগ ছড়িয়েছে।  মানে, আমেরিকায় তো করোনা মহামারী পুরোদমে চালু আছে, কিন্তু মিছিল মিটিংয়ের জন্যে সেটা আর নতুন করে বাড়েনি।  
মানে, হিসেব মত বাড়ার কথা কিন্তু বাড়েনি।  কি করে হল? ফেলুদার কথায়, 'যা খুঁজছিলাম  তা পাইনি, এবং সেটাই সিগনিফিকেন্ট'।বিজ্ঞানীরা তাই খুঁটিয়ে দেখেছেন। এবং একটা সহজ সরল সত্য আবার সামনে এসেছে - ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে প্রতিবাদ মিছিল মিটিংয়ে অংশগ্রহণকারীরা প্রায় সবাই ভাল করে, যত্ন করে মাস্ক পরেছিলেন। এটাই অবশ্য শেষ কথা নয়, কিন্তু করোনার সঙ্গে লড়তে মাস্ক যে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তাতে কোন সন্দেহ নেই।  

দেখুন সোজা হিসেবে,  ভিড় বাস, ট্রেন,  ভিড় বাজার করতে আমাদের বেরোতেই হবে। অভিজিৎ বাবুর কথা মেনে যদি (সুইস ব্যাঙ্ক থেকে ১৫ লাখ না হোক) নিজেদের RBI থেকেই টাকা পাওয়া যেত তাহলে হয়ত আমাদের কম বেরোতে হত, কিন্তু সে তো আসেনি, আসবেও না মনে হয়। হাতে আছে মাস্ক। মাস্ক মাস্ক মাস্ক।  এ ছাড়া গতি নেই। AIDS মহামারী রুখতে যেমন কন্ডোম, করোনা মহামারী থেকে বাঁচতে তেমন মাস্ক।  মাস্ক ভালো করে পড়তে হবে, রেগুলার পড়তে হবে, বাড়ি ফিরে সাবান দিয়ে কেচে দিতে হবে , আর হাতে হেলমেটের মোট থুতনিতে মাস্ক পরে কেত মারলে চলবে না।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল SCIENCEএ প্রকাশিত একটি ডায়াগ্রাম দিয়ে শেষ করি।  ভাল থাকবেন। মাস্ক পরবেন, পরতে বলবেন।  
  



তথ্য: 


 স্কুল খুলুক, সঙ্গে হাওয়া বাতাস খেলুক ক্লাসঘরে ('এই সময়' সংবাদপত্রে প্রবন্ধ -  ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১)      সোজাসাপ্টা অপ্রিয়   সত...